শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

অন্তঃসত্ত্বা নারীসহ ৬ ভারতীয় নাগরিকের জামিন : জিম্মাদারের কাছে হস্তান্তর

কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ’র অবৈধভাবে পুশইন করা অন্তঃসত্ত্বা এক নারীসহ ৬ ভারতীয় নাগরিককে জামিন দিয়েছেন আদালত। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (তৃতীয় বিচারিক আদালত) মো. আশরাফুল হক গত সোমবার তাদের জামিন মঞ্জুর করেন।
সোনালী খাতুন নামে অন্তঃসত্ত্বা ভারতীয় নারীর সন্তান প্রসবের সময় ঘনিয়ে আসায় এবং কারাগারে দুই শিশুর থাকার বিষয়টি মানবিক দিক বিবেচনায় তাদের জামিন দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নয়াগোলা মহল্লার ফারুক হোসেন নামে এক ব্যক্তির জিম্মায় দেন আদালত। তবে রাতেই ৬ ভারতীয় নাগরিককে থানা নিরাপত্তা হেফাজতে নেয় পুলিশ।
ভারতীয় নাগরিকরা হলেন— পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মন্নু শেখের ছেলে দানেশ (২৮), ভোদু শেখের মেয়ে সোনালী খাতুন (২৬), সেরাজুল শেখের মেয়ে সুইটি বিবি (৩৩), আজিজুল দেওয়ানের ছেলে কুরবান শেখ (১৬) ও ইমাম দেওয়ান (৬) এবং দানেশের ছেলে সাব্বির শেখ (৮)।
জানা যায়, সোমবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কারাগার থেকে বের হন ৬ ভারতীয় নাগরিক। এসময় জিম্মাদার ফারুক হোসেন তাদের গ্রহণ করেন। এসময় সাথে ছিলেন মফিজুল শেখ। তিনি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার পাইকর গ্রাম পঞ্চায়েতের সাবেক মেম্বার।
অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুন বলেন, কারাগারে তারা অত্যন্ত ভালো পরিবেশে ছিলেন। তাদের বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধারার জন্য সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
সোনালী জানান, তাদের বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার পাইকর গ্রামে। স্বামীসহ তিনি ভারতের দিল্লিতে ইটভাটায় কাজ করতেন। চলতি বছরের ২০ জুন ভারতীয় পুলিশ তাদের জোরপূর্বক গ্রেপ্তার করে শিশুসহ ছয়জনকে ‘বাংলাদেশী’ হিসেবে দেখিয়ে ২৬ জুন কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে পুশইন করে। প্রথমে বিমানে হরিয়ানা থেকে আসামে আনা হয় তাদের। এরপর সড়কপথে কুড়িগ্রামের সীমান্তবর্তী এলাকায় রাখা হয়। পরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ তাদের বাংলাদেশের গহীন জঙ্গলে ছেড়ে দেয়। জঙ্গল ও নদী পার হয়ে তারা কুড়িগ্রামে এসে পৌঁছায়।
ভারতীয় গ্রাম পঞ্চায়েত নেতা মফিজুল শেখ জানান, এদের দেশে ফেরত নিতে তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও রাজ্যসভার সাংসদ সামিরুল ইসলামের প্রতিনিধি হিসেবে এসেছেন। কলকাতা সুপ্রিম কোর্ট অন্তঃসত্ত্বা সোনালী খাতুন ও তার ৮ বছরের সন্তানকে দেশে ফেরত আনার জন্য ভারত সরকারকে আদেশ দিয়েছেন। এখন বাংদেশের আইন অনুযায়ী এবং দুই দেশের সরকারের মাধ্যমে তাদের দেশে ফেরত নিয়ে যেতে চাই।
বাংলাদেশী জিম্মাদার ফারুক হোসেন বলেন, আমার দাদার বাড়ি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলার পাইকর গ্রামে। সেখান থেকে এ বিষয়ে কাজ করার জন্য আমাকে বলা হয়। এছাড়া মানবিক কারণে আমি আদালতের মাধ্যমে তাদের জিম্মা নিয়েছি। যেহেতু তারা এখনই ভারতে যেতে পারবে না, সেজন্য নয়াগোলায় আমার বাড়ির পাশে তাদের জন্য একটি বাড়ি ভাড়া করেছি। এখন তারা সেখানে থাকবে।
ফারুক হোসেনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট একরামুল হক পিন্টু জানান, আদালত অন্তঃসত্ত্বা সোনালী বেগম ও দুই শিশুর কারাগারে থাকার বিষয়টি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে জামিন মুঞ্জুর করেছেন। তবে তাদের বিরুদ্ধে থাকা অবৈধ অনুপ্রবেশের মামলাটি নিষ্পত্তি না হওয়ায় তারা এখনই দেশে ফেরত যেতে পারবেন না।
এদিকে রাতেই ৬ ভারতীয় নাগরিককে থানা নিরাপত্তা হেফাজতে নিয়ে আসার বিষয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস মঙ্গলবার সাংবাদিকদের জানান, আদালতের জামিনের কাগজপত্র না পাওয়ায় রাতে ভারতীয় এই ছয় নাগরিককে শুধুমাত্র পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়েছে। আজ মঙ্গলবার আদালতের কাগজ হাতে পেয়েছি, যে ব্যক্তির জিম্মায় তাদের জামিন দেয়া হয়েছে তিনি ও একজন আইনজীবী ডেকে ভারতীয় নাগরিকদের জিম্মাদারের কাছে দেয়া হবে।
এদিকে  মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.এন.এম. ওয়াসিম ফিরোজ জানান, জিম্মাদারের নিকট ভারতীয় এই ছয় নাগরিককে হস্তান্তর করা হয়েছে। দশ দিন পর আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, চলতি বছরের ২০ জুন দিল্লিতে ভারতীয় পুলিশ তাদের জোরপূর্বক গ্রেপ্তার করে এবং ২৬ জুন বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে পুশইন করে। কিছুদিন কুড়িগ্রাম ও ঢাকায় অবস্থানের পর তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসেন এই ছয় ভারতীয় নাগরিক। পরে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে গত ২০ আগস্ট চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌর এলাকার আলীনগর ভূতপুকুরের একটি বাড়ি থেকে তাদের আটক করে পুলিশ। পরে আদালতের মাধ্যমে তাদেরকে কারাগারে পাঠানো হয়।

শেয়ার করুন