শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

কোনো অবস্থাতেই ফসলি জমি নষ্ট করা যাবে না : কৃষি উপদেষ্টা

কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, কোনো অবস্থাতেই ফসলি জমি নষ্ট করা যাবে না। দুই ফসলি ও তিন ফসলি জমিতে কোনো স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না।
তিনি আরো বলেন, কৃষি জমি সংরক্ষণে কঠোর বিধান রেখে ‘ভূমি ব্যবহার ও কৃষি ভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ’ প্রণয়নের কাজ চলছে।
বৃহস্পতিবার কৃষি মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের গত এক বছরের সাফল্য, অর্জন ও সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, ‘গত এক বছরে ৮৮ লাখ ৫৫ হাজার ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকের মধ্যে বিনামূল্যে সার, বীজ, চারা এবং অন্যান্য সহায়তা বাবদ ৮৯৩ কোটি ২০ লাখ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে।’
তিনি জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে আমন ১৬৫.১৪৫ লাখ মেট্রিক টন (চালে), আউশ ২৭.৯৩৪ লাখ মেট্রিক টন (চালে), বোরো ২২৬.৮২ লাখ মেট্রিক টন (চালে), মোট ধান (চালে) ৪১৯.১৬১ লাখ মেট্রিব টন, আলু ১১৫.৭৩৬ লাখ মেট্রিক টন, গম ১০.৪১১ লাখ মেট্রিক টন, ভুট্টা ৭৩.৯৯৪ লাখ মেট্রিক টন, পেঁয়াজ ৪৪.৪৮৭ লাখ মেট্রিক টন, রসুন ৭.৮৮৭ লাখ মেট্রিক টন, আদা ২.৫১৪ লাখ মেট্রিক টন, কাঁচামরিচ ১৬.৪২৮ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদিত হয়েছে।
তিনি বলেন, সারের বকেয়া ২০ হাজার ৬৯১ কোটি টাকাসহ মোট ৭ হাজার ৬৮৪.৯৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। রাশিয়া থেকে বিনামূল্যে ৩০ হাজার মেট্রিক টন সার প্রাপ্তির কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সার আমদানির সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়ায় সরকারের ২৩৩.৬১ কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯’ হালনাগাদ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
পাটকলের অব্যবহৃত গুদামকে সার মজুতের জন্য ব্যবহার করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে উপদেষ্টা জানান।
উপদেষ্টা বলেন, “ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন বিএডিসিকে সার ক্রয়ে ২০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার ঋণ প্রদানে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ইতোমধ্যে ১০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। জৈব সারের ব্যবহার বৃদ্ধির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বালাইনাশক বিধিমালা সংশোধন করা হচ্ছে। গত এক বছরে ২৬৪৬.১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৯টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে এবং ৩টি পরিমার্জন ও ২টি প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে।”
তিনি বলেন, শাক-সবজি সংরক্ষণে ১০০টি মিনি কোল্ড স্টোরেজ স্থাপন করা হচ্ছে। পেঁয়াজ ও আলু সংরক্ষণের জন্য এয়ারফ্লো মেশিন ও বিশেষ ঘর নির্মাণ করে দেওয়া হচ্ছে।
আলুর দাম হিমাগার গেট পর্যায়ে সর্বনিম্ন ২২ টাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। কৃষকের কাছ থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন আলু ক্রয় করা হবে বলে উপদেষ্টা জানান।
কৃষিপণ্য রপ্তানি আয় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি, চীনে প্রথমবারের মতো আম রপ্তানি, চলতি মৌসুমে ৬২ হাজার ৫১ টন আলু রপ্তানি এবং গাবতলীতে রপ্তানির জন্য ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট নির্মাণ হচ্ছে বলে জানান তিনি।
উপদেষ্টা বলেন, “ফল ও সবজি চাষে উন্নত কৃষি চর্চা (জিএপি) অনুসরণ করা হচ্ছে। আম, কাঁঠাল, পেয়ারা, বেগুন, বরবটি, লাউ, পটল, কাঁচা পেঁপে, আলু, বাঁধাকপি, চিচিঙ্গা, করলা, কচুর লতি, আনারস ও জারা লেবু— এই ১৫টি ফসলের জিএপি প্রোটোকল চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।”
তিনি বলেন, দেশে উৎপাদিত আঁশ তুলাকে কৃষিপণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা চলতি বছরের ৫ জুন গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে।
উপদেষ্টা বলেন, পরিবেশ রক্ষায় আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাসের চারা ধ্বংস করা হয়েছে, বিপরীতে প্রতি চারায় ৪ টাকা প্রণোদনা দেওয়া হয়েছে। ৩৩ লাখ দেশীয় জাতের ফলদ ও বনজ গাছ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, টেকসই, আধুনিক কৃষি ও সকলের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিতে ‘কৃষি উন্নয়ন রূপরেখা পরিকল্পনা ২০২৫-২০৫০’ তৈরি করা হচ্ছে।
জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, দেশের প্রতিটি ভূমি মৌজাকে ডাটাবেইসের আওতায় আনা হয়েছে। সার, বীজ, বালাইনাশক, সেচ, ফসল বৈচিত্র্য, আবহাওয়া ও রোগ-বালাইসহ কৃষিসংশ্লিষ্ট সকল তথ্য সন্নিবেশিত করে একটি মোবাইল অ্যাপ ‘খামারি’ চালু করা হয়েছে। কর্মকর্তাদের জন্য ‘খামারি অ্যাপ’ ও ‘ক্রপ জোনিং সিস্টেম’ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, কৃষকের পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে প্রণোদনা হিসেবে কৃষি বিভাগের ট্রাক ও ট্র্যাকিং সিস্টেম ব্যবহার, কৃষি বিপণন অধিদপ্তরকে আধুনিকীকরণ এবং আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণায় সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
বীজ ব্যবস্থাপনা অনলাইনভিত্তিক করার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
উপদেষ্টা আরো বলেন, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং এর অধীন বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থার ১০৯ জন বঞ্চিত কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, ১৯ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে, ৬৪৫ জন কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে এবং শতাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পাওয়া নানা অনিয়মের অভিযোগে দুর্নীতি তদন্তের জন্য দুদককে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় অর্থে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনার নামকরণে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিবর্গের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

শেয়ার করুন