গণভোটের অধ্যাদেশ জারি

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়নে গণভোটের অধ্যাদেশ জারি করেছে সরকার। আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে গত মঙ্গলবার রাতে গেজেটটি প্রকাশ করা হয়।
আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথম দিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে একই দিনে আয়োজন করা হবে গণভোট। গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের অভিপ্রায় নেয়া হবে।
অধ্যাদেশে বলা হয়, চব্বিশের ছাত্র-জনতার সফল গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রকাশিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগের উদ্দেশ্যে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ এ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রহিয়াছে কিনা, তা যাচাইয়ের জন্য গণভোটে উপস্থাপন করতে সরকার জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ প্রণয়ন ও জারি করেছে।
এতে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত কতিপয় প্রস্তাবের বিষয়ে জনগণের সম্মতি রয়েছে কিনা তা যাচাইয়ে গণভোটের বিধান প্রণয়নকল্পে প্রণীত এ অধ্যাদেশ।
অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ অনুসারে গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য আইন প্রণয়নের নির্দেশনা রয়েছে। সংসদ ভেঙে যাওয়া অবস্থায় রয়েছে এবং রাষ্ট্রপতির নিকট ইহা সন্তোষজনকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে, আশু ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি বিদ্যমান রয়েছে, তাই সেহেতু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৯৩ (১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে রাষ্ট্রপতি গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করেন। এটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
অধ্যাদেশের ১ ও ২ ক্রমিকে সংক্ষিপ্ত শিরোনাম ও প্রবর্তন এবং সংজ্ঞা উল্লেখ করা হয়েছে। অধ্যাদেশের ৩ ক্রমিকে গণভোটের প্রশ্ন বিষয়ে এ অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, গণভোটে একটি প্রশ্ন উপস্থাপন করা হইবে— “আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত নিম্নলিখিত প্রস্তাবসমূহের প্রতি আপনার সম্মতি জ্ঞাপন করিতেছেন?”; (হ্যাঁ/না)
অধ্যাদেশে আরো বলা হয়েছে যে, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। আগামী জাতীয় সংসদ হইবে দুই কক্ষ বিশিষ্ট ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্য বিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন দরকার হবে। সভাপতি নির্বাচন, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকার, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাসহ তফসিলে বর্ণিত যে ৩০টি বিষয়ে জুলাই জাতীয় সনদে ঐকমত্য হয়েছে— সেগুলো বাস্তবায়নে আগামী সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক দলগুলো বাধ্য থাকবে। জুলাই জাতীয় সনদে বর্ণিত অপরাপর সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
অধ্যাদেশের ৪নং ক্রমিকে ভোট কেন্দ্র বিষয়ে বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য যে সকল ভোট কেন্দ্র নির্ধারণ করা হবে সেই সকল ভোট কেন্দ্রে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। ক্রমিক ৫-এ রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ বিষয়ে বলা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য কমিশন কর্তৃক যে সকল রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ ও অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করা হবে সেই সকল রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসারগণ গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য সংশ্লিষ্ট অধিক্ষেত্রে নিযুক্ত হয়েছেন বলে গণ্য হবে।
ক্রমিক ৬-এ, প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার নিয়োগ বিষয়ে বলা হয়েছে। (১) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য যে সকল প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারগণ নিযুক্ত হবেন সেই সকল প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসার গণভোট অনুষ্ঠানের জন্য সংশ্লিষ্ট ভোটকেন্দ্রে নিযুক্ত হযেছেন বলে গণ্য হবে। (২) প্রিজাইডিং অফিসার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সাথে একই সময়ে গণভোট গ্রহণ কার্য পরিচালনা করবেন এবং ভোট কেন্দ্রের শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য দায়ী থাকবেন এবং তার মতে ভোট গ্রহণে নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হতে পারে এরূপ ঘটনা সম্পর্কে রিটার্নিং অফিসারকে অথবা সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে অবহিত করবেন। (৩) সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার প্রিজাইডিং অফিসারের সেই সকল ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন যে সকল ক্ষমতা ও দায়িত্ব কমিশন কর্তৃক নির্ধারণ করে দেওয়া হবে বা প্রিজাইডিং অফিসার কর্তৃক তার ওপর অর্পণ করা হবে। (৪) যদি অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে প্রিজাইডিং অফিসার ভোট কেন্দ্রে উপস্থিত না থাকেন বা তার দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হন, তা হলে রিটার্নিং অফিসার অথবা সহকারী রিটার্নিং অফিসার সহকারী প্রিজাইডিং অফিসারদের মধ্য হতে একজনকে প্রিজাইডিং অফিসারের স্থলে কাজ করার ক্ষমতা অর্পণ করবেন। (৫) ভোট গ্রহণ চলাকালীন যে কোনো সময় সহকারী রিটার্নিং অফিসার, কারণ লিপিবদ্ধ করে, যে কোনো প্রিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার অথবা পোলিং অফিসারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করতে পারবেন এবং উক্তরূপ সাময়িকভাবে বরখাস্তকৃত অফিসারের দায়িত্ব পালনের জন্য তার বিবেচনায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবেন।
৭নং ক্রমিকে ভোটার তালিকা বিষয়ে বলা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, ১) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতকৃত ভোটার তালিকা হবে গণভোটের ভোটার তালিকা। (২) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সহকারী রিটার্নিং অফিসার কর্তৃক প্রিজাইডিং অফিসারের নিকট সরবরাহকৃত প্রত্যেক ভোট কেন্দ্রের জন্য ভোটদানের অধিকারী ভোটারগণের নাম সংবলিত ভোটার তালিকা গণভোটের ভোটার তালিকা হিসাবে ব্যবহৃত হবে।
৮নং ক্রমিকে গণভোট গ্রহণের সময় বিষয়ে বলা হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের সময় ইবে গণভোটের ভোট গ্রহণের সময়। ৯নং ক্রমিকে মুলতুবি ভোটগ্রহণ বলা হয়েছে। (১) যদি প্রিজাইডিং অফিসারের নিয়ন্ত্রণ বহির্ভূত কোনো কারণে ভোটগ্রহণ বাধাগ্রস্ত বা ব্যহত হয়, তা হলে তিনি ভোট গ্রহণ স্থগিত বা বন্ধ করে দিতে পারবেন, এবং তৎসম্পর্কে রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসারকে অনতিবিলম্বে অবহিত করবেন। (২) যে ক্ষেত্রে উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো ভোট কেন্দ্রে ভোট গ্রহণ বন্ধ করা হয়েছে সেই ক্ষেত্রে রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার অনতিবিলম্বে তৎসংক্রান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে কমিশনের নিকট প্রতিবেদন পেশ করবেন এবং কমিশন যদি এই মর্মে সন্তুষ্ট হয় যে, অন্যান্য ভোট কেন্দ্রের ফলাফল দ্বারা গণভোটের ফলাফল নির্ধারণ করা সম্ভব না, তা হলে কমিশন উক্ত ভোট কেন্দ্রে পুনরায় ভোট গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করবে। কমিশন কোনো ভোট কেন্দ্রে পুনরায় ভোট গ্রহণের নির্দেশ দিলে, রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার যথাশিগগির সম্ভব ভোট গ্রহণের তারিখ, স্থান ও সময় নির্ধারণ করে একটি গণবিজ্ঞপ্তি জারি করবেন।
১০নং ক্রমিকে বলা হয়েছে, গোপন ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট গ্রহণ। (১) গোপন ব্যালটের মাধ্যমে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে এবং উল্লিখিত প্রশ্নটিতে জনমত যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে কমিশন কর্তৃক নির্ধারিত একক ব্যালটের মাধ্যমে প্রত্যেক ভোটার ভোটদান করবেন। (২) গণভোটের ব্যালট ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যালট হতে পৃথক ও ভিন্ন রঙের হবে। ব্যালট বাক্স বিষয়ে বলা হয়েছে, (১) নির্বাচন কমিশন কর্তৃক অনুমোদিত, নির্ধারিত এবং সরবরাহকৃত ব্যালট বাক্স ভোট গ্রহণের জন্য ব্যবহার করতে হবে। তবে শর্ত থাকে যে, কমিশন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য সরবরাহকৃত একই ব্যালট বাক্স গণভোটের ব্যালট বাক্স হিসাবে ব্যবহার করার অনুমতি প্রদান করতে পারবে। (২) রিটার্নিং অফিসার বা সহকারী রিটার্নিং অফিসার প্রত্যেক প্রিজাইডিং অফিসারকে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ব্যালট বাক্স সরবরাহ করবেন।