চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম নিয়েও কাজ করছে প্রয়াস
শাহরিয়ার শিমুল

দেশে আমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত চাঁপাইনবাবগঞ্জ। বাংলাদেশের মোট আম উৎপাদনের অর্ধেকেরও বেশি এই জেলায় উৎপাদিত হয়। পাঁচ লক্ষেরও বেশি মানুষ আম উৎপাদন ও ব্যবসার সাথে জড়িত। এখন বছরব্যাপীও (অফ-সিজন) আমচাষ হচ্ছে জেলাতে।
দেশের চাহিদা মিটিয়ে এখন আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা মেটাতে এবং রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের লক্ষে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে অনেকেই। প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি ক্ষুদ্রঋণের পাশাপাশি চাঁপাইনবাবগঞ্জে আম নিয়েও কাজ করছে কয়েক বছর থেকে। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)’র সহযোগিতায় পরিবেশসম্মত উপায়ে নিরাপদ আম উৎপাদন করতে সহায়তা করছে।
কাজের মধ্যে রয়েছে— আম (পড়ে যাওয়া আমসহ) সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ করে আমের পানীয়, আমসত্ত্ব, কাটা শুকনো আম, বিভিন্ন আচার, আমচুর, সবুজ আমের গুঁড়ো তৈরি এবং বাজারজাত।
প্রয়াস জানাচ্ছে, আম দিয়ে পাল্প পেস্ট ও ভোজ্যতেল তৈরি এবং রসের গুঁড়ো ব্যবহার করে বেকড পণ্য ও বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি তৈরি করা যেতে পারে। অন্যদিকে, আমের খোসা এবং অন্যান্য আনুষাঙ্গিক বর্জ্য ইত্যাদি জৈব সারে রূপান্তরিত করে পরিবেশ দূষণ রোধে কৃষিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। ইউনিয়ন পর্যায়ে আম হাব ক্লাস্টার স্থাপনের মাধ্যমে সময়, শ্রম এবং খরচ কমিয়ে সহজ বাজার অ্যাকসেস তৈরিরও বিস্তৃত সুযোগ রয়েছে।
এসব কার্যক্রম সম্পূর্ণরূপে পরিবেশবান্ধব, জলবায়ু স্থিতিস্থাপক, সম্পদ দক্ষ, অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর, টেকসই এবং লাভজনক ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করবে। সামগ্রিকভাবে, সবুজ প্রবৃদ্ধি পুরুষ ও নারীদের জন্য কর্মসংস্থান তৈরিতে ভূমিকা পালন করবে। আমের ব্যবসায়িক ক্লাস্টারের মূল্য শৃঙ্খল অভিনেতাদের সক্ষমতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোগগুলো সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে।
এ লক্ষে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা, শিবগঞ্জ, ভোলাহাট, নাচোল, গোমস্তাপুরে নিরাপদ আম উৎপাদন বিষয়ে ক্ষুদ্রঋণ ও বিভিন্ন ধরনের উপকরণ সহায়তা দিচ্ছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর থেকে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমকে এগিয়ে নিতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে ১৭ কোটি ৪৯ লাখ ৯৪ হাজার টাকা বিতরণ করেছে প্রয়াসের সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মাট) প্রজেক্ট।
প্রয়াসের সহায়তায় নিরাপদ উপায়ে আম উৎপাদন করে লাভবান হচ্ছেন অনেকেই। তেমনি একজন সদর উপজেলার কালুপুর গ্রামের আব্দুল জাব্বার। ২০০৭ সাল থেকে প্রয়াসের সঙ্গে যুক্ত আছেন তিনি। সেসময়ে তিনি প্রয়াসের কৃষি ইউনিটের সহায়তায় ধান, গম ও মসুর ডাল তৈরির প্রশিক্ষণ নিয়ে এগুলোর ব্যবসা শুরু করেন। তারপরে ২০২০ সালে প্রয়াসের সাসটেইনেবল এন্টারপ্রাইজ প্রজেক্ট (এসইপি)’র মাধ্যমে আম উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু করেন আমবাগান তৈরির।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার আমারকে ১৫ বিঘা জমি লিজ নিয়ে শুরু করেন আমবাগান। এখন প্রয়াসের সাসটেইনেবল মাইক্রোএন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড রেজিলিয়েন্ট ট্রান্সফরমেশন (স্মার্ট) প্রকল্পের মাধ্যমে ঋণ নিয়ে ঠাকুর পলশা গ্রামে গড়ে তোলেন ২৫ বিঘার আমবাগান; যেখানে তিনি নিরাপদ উপায়ে চাষ করছেন আম্রপালি আম। স্মার্ট প্রকল্পের মাধ্যমে ২ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে আমবাগান পরিচর্যা করছেন প্রয়াসের কৃষিবিদদের সহযোগিতায়।
আব্দুল জাব্বার বলেন, প্রয়াসের সাথে আমি কয়েকবছর থেকে যুক্ত আছি। প্রথমে ধান, গম ও মসুর ডালের বীজ তৈরি করতাম। পরবর্তীতে প্রয়াসের কর্মকর্তাদের সহায়তায় নিরাপদ উপায়ে আম উৎপাদন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিই এবং বাগান শুরু করি। বর্তমানে আমি আমারক ও ঠাকুর পলশা গ্রামে প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর আমবাগান তৈরি করেছি।
তিনি আরো বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চল হওয়ায় সেচ দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল না। প্রয়াসের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় আমি ঠাকুর পলশা গ্রামে সোলার প্যানেল স্থাপন করি, যার মাধ্যমে নিজের বাগানে সেচ দেয়ার পাশাপাশি আশপাশের লোকদেরও সহযোগিতা করতে পারছি। এমনকি এখান থেকে বছরে আড়াই লাখ টাকা আয়ও করতে পারছি।
আব্দুল জাব্বার বলেন, স্মার্ট প্রকল্পের মাধ্যমে যদি বাগানে কীটনাশক প্রয়োগের জন্য পাওয়ার স্প্রেয়ার মেশিন, মিনি ভ্যান গাড়ি বা আম শোধনাগারের ব্যবস্থা করলে আমাদের মতো আমচাষিদের জন্য অনেক উপকার হতো। তিনি আরো বলেন, প্রয়াস নিরাপদ উপায়ে আমচাষ বিষয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। প্রশিক্ষণ নিয়ে আমি আমবাগানে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতিতে আম উৎপাদন করি। এতে কীটনাশক কম লাগে ও খরচ অনেকটা কমে যায়। তারা (প্রয়াস) ফ্রুট ব্যাগ সাপোর্টও দিয়ে থাকে।
আব্দুল জাব্বার বলেন, আমার আমের বাগান দেখে উৎসাহিত হয়ে আমার পাশে বুলবুল, সাত্তার ও আনারুল নামে আরো কয়েকজন নিরাপদ উপায়ে আম উৎপাদন করছে। তারাও এখন লাভবান হচ্ছে। এসময় তিনি আরো বলেন, আমি অনলাইনের মাধ্যমে ভোক্তাদের কাছে আম পৌঁছে দেই। এছাড়াও প্রয়াসের কর্মকর্তাদের পরামর্শে গুড এগ্রিকালচার প্র্যাকটিস (গ্যাপ)’র সার্টিফিকেট পেয়েছি, যার মাধ্যমে আমি এখন থেকে বিদেশে আম রপ্তানি করতে পারব।
তিনি বলেন, প্রয়াসের কাছ থেকে আর্থিক ও টেকনিক্যাল অনেক সাপোর্ট পেয়েছি এবং পাচ্ছি। যার ফলে এই বছরে আমি আরো ৬ বিঘা জমিতে কাটিমন আমের চারা রোপণ করেছি।
আব্দুল জাব্বারের আমবাগানে প্রতিদিন ১০ জন করে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। এছাড়াও আমের মৌসুমে ২০ জন কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, যাদেরকে নিয়মিত ৫০০ টাকা করে মজুরি দেয়া হয়।
শাহরিয়ার শিমুল : অফিসার, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি