শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

নাচোলের বাইরুল মাছ চাষ করছেন ১০ বছর ধরে
প্রয়াসের সহযোগিতায় ‘ভালো’ লাভ করছেন ২ বছর থেকে

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোল উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নের পাহাড়পুর গ্রামের মাছচাষি বাইরুল ইসলাম আজ অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত। প্রায় এক দশক ধরে এই পেশার সাথে জড়িত বাইরুল ইসলাম শুরুতে লাভ করতে না পারলেও এখন মাছ চাষ করেই বছরে আয় করছেন ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা।
প্রথমদিকে অন্যের পুকুর লিজ নিয়ে মাছ চাষ করতেন। আর পোনা কিনতেন বিভিন্ন জায়গা থেকে। এতে উৎপাদন খরচের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ চলে যেত শুধু পোনা কিনতেই। দুই বছর ধরে তিনি নিজেই মাছের ডিম কিনে পোনা উৎপাদন শুরু করেছেন। এতে করে মাছের পোনা কেনার খরচ যেমন কমেছে, তেমনি অতিরিক্ত পোনা বিক্রি করে প্রয়োজনীয় অন্যান্য খরচও উঠে আসছে। বর্তমানে তিনি ২০ বিঘার ৫টি পুকুরে মাছ চাষ করছেন।
বাইরুল ইসলাম জানান, প্রায় সাত-আট বছর বাইরের পোনা কিনে মাছ চাষ করতেন। এতে লাভের মুখ সেভাবে দেখতে পাননি। দুই বছর আগে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাকের সাথে রাস্তায় হঠাৎ দেখা হয় তার। তখনো তিনি পোনা উৎপাদনের কৌশল বা মাছের সঠিক খাবার ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো তেমন জানতেন না।
এরপর আব্দুর রাজ্জাকের পরামর্শে ‘প্রয়াসে’র পক্ষ থেকে মাছ চাষ ও ডিম থেকে পোনা উৎপাদন বিষয়ে দুই দিনের একটি প্রশিক্ষণ নেন বাইরুল। সেই প্রশিক্ষণে প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণও পান। এরপর থেকেই তার মাছ চাষে আসে আমূল পরিবর্তন।
মাছ চাষে বাইরুলের মূল খরচ হতো তিনটি ক্ষেত্রে— এক. পুকুর লিজ, দুই. মাছের পোনা ও তিন. পরিবহন, খাবার ও শ্রমিক (মাছ ধরা ইত্যাদি)।
বর্তমানে নিজের উৎপাদিত পোনা ব্যবহারের মাধ্যমে একটি বড় খরচের ধাপ কমে গেছে। বরং বাড়তি পোনা অন্য চাষিদের কাছে বিক্রি করে তার মাছ চাষের মোট খরচ প্রায় উঠে আসে। এতে তিনি বছরে প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ টাকা আয় করছেন।
মাছ চাষে বাইরুলের দুই ছেলে নিয়মিত তাকে সহযোগিতা করেন। পাশাপাশি তিনি বর্তমানে আধুনিক পদ্ধতিতে পোনা উৎপাদন করছেন। তিনি জানান, রেণু পোনার মূলত দুটি ধাপ থাকে— আঁতুড় পুকুর এবং লালন পুকুর। প্রথমে ডিম এনে আঁতুড় পুকুরে ১০ থেকে ১৫ দিন নার্সিং করার পর তা লালন পুকুরে স্থানান্তর করতে হয়। সেখানে দেড় থেকে দুই মাস পরিপালন করে তা অন্য পুকুরে স্থানান্তর বা পোনা হিসেবে বিক্রি করা হয়।
প্রয়াসের মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক বলেন, “বাইরুল ইসলাম শুরুতে প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ চাষ করতেন। তার মাছ চাষ সম্পর্কে জানার পর তাকে পোনা উৎপাদনের পরামর্শ দেই এবং প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তা প্রদান করি। এখন তিনি নিজেই পোনা উৎপাদন করে খরচ কমিয়ে অনেক বেশি লাভ করছেন।”
তিনি আরো জানান, বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে বানিজ্যিকভাবে মাছ চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকে ফ্যাটেনিং পদ্ধতিতে মাছ চাষ করছেন। এতে করে পোনার চাহিদাও বেড়েছে। ফলে স্থানীয় চাষিরা যদি নিজেরাই পোনা উৎপাদন করতে পারেন, তবে তারা লাভবান হবেন এবং বাইরের ওপর নির্ভরশীলতাও কমে আসবে।
রাজ্জাক বলেন, মাছ চাষ বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে একটি সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি সহায়তায় এবং সঠিক পদ্ধতি মেনে মাছ চাষ করলে এটি থেকে ভালো আয় করা সম্ভব। বাইরুল ইসলামের মতো উদ্যোগীরা এখন অনেককে অনুপ্রাণিত করছেন মাছ চাষে যুক্ত হতে।
বাইরুল ইসলাম জানান, সঠিক প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ পেলে বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলের বহু মানুষ মাছ চাষ করে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারেন।

শেয়ার করুন