শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

নিরাপদ সড়ক হোক প্রতিদিনের বাস্তবতা

আব্দুল্লাহ সাহেদ

আজ ২২ অক্টোবর, জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস। এটি শুধু একটি দিবস নয়, এটি বাংলাদেশের সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর এক জোরালো সামাজিক আন্দোলনের প্রতীকী দিন। এটি সড়কে প্রতিদিন ঘটে চলা মৃত্যুর মিছিলের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার কণ্ঠ। এটি স্বজন হারানোর বেদনার্ত আর্তনাদ থেকে জন্ম নেয়া এক সম্মিলিত অঙ্গীকার। প্রতি বছর এই দিনটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সড়ককে নিরাপদ রাখা আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব। যে মর্মান্তিক ব্যক্তিগত শোক থেকে এই দিবসের উৎপত্তি, তা আজ লাখ লাখ মানুষের নীরব কান্না ও বলিদানকে ধারণ করে এক জাতীয় দাবিতে পরিণত হয়েছে। এই দিবসের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সড়কের বর্তমান পরিস্থিতি, দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিসংখ্যান, এর পেছনের কারণ এবং একটি টেকসই ও নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলার পথের কাঁটা ও উত্তরণের উপায় নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ ও আলোচনা অত্যন্ত জরুরি। কেবল দিবস পালনের আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এর অন্তর্নিহিত চেতনাকে অনুধাবন করে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণই পারে এই দিনটিকে অর্থবহ করে তুলতে।
জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের পেছনের ইতিহাসটি গভীর বেদনা ও একই সাথে এক অদম্য সংগ্রামের। ১৯৯৩ সালের ২২ অক্টোবর এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন চলচ্চিত্র অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী জাহানারা কাঞ্চন। এই ব্যক্তিগত বিপর্যয় ইলিয়াস কাঞ্চনকে পরিণত করে একজন সমাজযোদ্ধায়। তিনি উপলব্ধি করেন যে, এই নীরব ঘাতক, এই সড়ক দুর্ঘটনা, প্রতিদিন অসংখ্য পরিবারকে তার মতোই অসহনীয় কষ্টের সাগরে ভাসাচ্ছে। স্ত্রীর অকালমৃত্যুর শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে তিনি গড়ে তোলেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলন।
এই আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশব্যাপী ব্যাপক জনসমর্থন লাভ করে এবং সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে এক অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। এই সামাজিক আন্দোলনের ধারাবাহিক সাফল্যের ফলস্বরূপ এবং সড়ক নিরাপত্তার গুরুত্বকে জাতীয় পর্যায়ে স্বীকৃতি দিতে বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে ২২ অক্টোবরকে ‘জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো— সড়ক দুর্ঘটনা রোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা, সড়ক ব্যবহারকারীদের মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ তৈরিতে উৎসাহিত করা এবং সড়ককে নিরাপদ করার জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে তাদের করণীয় সম্পর্কে সচেতন করা।
একটি নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা কেবল সুনির্মিত রাস্তা বা ফ্লাইওভারের সমষ্টি নয়, এটি একটি সমন্বিত ব্যবস্থা; যেখানে আইনের সঠিক প্রয়োগ, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত যানবাহন, প্রশিক্ষিত চালক এবং সচেতন পথচারী— এই পাঁচটি স্তম্ভ একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হলো দুর্ঘটনার সংখ্যা ও এর ফলে সৃষ্ট হতাহতের হার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা, যা একটি সভ্য ও উন্নত রাষ্ট্রের অন্যতম পরিচায়ক।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের সড়কপথ আজও এক মৃত্যুফাঁদ। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছে, আর পঙ্গুত্ব বরণ করছে তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২২ সালে ৬ হাজার ৭৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৯৫১ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৩৫৬ জন আহত হয়েছেন। এই পরিসংখ্যানের ভয়াবহতা এখানেই শেষ নয়, বেসরকারি হিসাবমতে, এই সংখ্যা আরো অনেক বেশি।
দুর্ঘটনার কারণগুলো বহুবিধ এবং একটির সাথে অন্যটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, চালকদের মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং ওভারটেকিং করার মারাত্মক প্রবণতা দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালকের দৌরাত্ম্য, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগে শৈথিল্য এবং জনগণের মধ্যে ট্রাফিক আইন মেনে না চলার সংস্কৃতি। মহাসড়কগুলোতে দ্রুতগতির যানবাহনের পাশাপাশি ধীরগতির যানবাহন, যেমন— নসিমন, ইজিবাইক, অটোরিকশা, অটোভ্যান ও মোটরসাইকেলের অবাধ চলাচল পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। বিশেষ করে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই মোটরসাইকেল এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশই ঘটছে এই দ্বিচক্রযানে। তরুণদের মধ্যে বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালানোর প্রবণতা, হেলমেট ব্যবহারে অনীহা এবং ট্রাফিক আইনকে তোয়াক্কা না করা, গতিসীমা কোনোভাবেই না মেনে চলার মানসিকতা এই মৃত্যুকে যেন প্রতিনিয়ত আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। অন্যদিকে, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও তিন চাকার বাহনগুলো শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে মহাসড়কেও বিশৃঙ্খলভাবে চলাচল করছে, যা প্রতিনিয়ত বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করছে। বাস-ট্রাকের মতো ভারী যানবাহনের চালকদের একটি বড় অংশের বিরতিহীনভাবে দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো, মাদকাসক্তি এবং যান্ত্রিক ত্রুটি জেনেও গাড়ি চালানোর মতো বিষয়গুলো দুর্ঘটনার মাত্রাকে বহুগুণে বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেবল একটি জীবন বা কয়েকটি প্রাণের পরিসমাপ্তি ঘটায় না, এটি একটি পরিবারকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক দিক থেকে চিরতরে পঙ্গু করে দেয়। যখন একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি দুর্ঘটনায় নিহত বা আহত হন, তখন সেই পরিবারটির ওপর আকাশ ভেঙে পড়ে। একদিকে চিকিৎসার বিপুল খরচ জোগাতে গিয়ে পরিবারটি সর্বস্বান্ত হয়, ঋণে জর্জরিত হয়, এমনকি শেষ সম্বলটুকুও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়। অন্যদিকে, উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে সন্তানদের পড়াশোনা, খাওয়-পরা, দৈনন্দিন জীবনযাপন সবকিছু অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে যায়। বেঁচে থেকেও যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেন, তাদের জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। মানসিক যন্ত্রণা, হতাশা এবং সমাজের বোঝা হয়ে বেঁচে থাকার গ্লানি তাদের তিলে তিলে শেষ করে দেয়। এই পরিবারগুলোকে যে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তার কোনো আর্থিক পরিমাপ হয় না। এই মানবিক বিপর্যয়ের গভীরতা অনুধাবন করতে পারলেই নিরাপদ সড়কের প্রয়োজনীয়তা আমাদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং দুর্ঘটনা কমাতে একটি কার্যকর পদক্ষেপ হতে পারে যানবাহন অনুযায়ী আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা। উন্নত দেশগুলোতে দ্রুতগতির ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেন থাকার কারণে দুর্ঘটনা অনেক কম হয়। আমাদের মহাসড়কগুলোতে যদি ভারী যানবাহন, হালকা যানবাহন এবং মোটরসাইকেল ও অন্যান্য ধীরগতির বাহনের জন্য পৃথক লেন নির্দিষ্ট করে দেওয়া যায়, তবে গতির পার্থক্যজনিত সংঘাত এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুলাংশে হ্রাস পাবে। কিন্তু এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হলো আমাদের সড়কের অপ্রতুল প্রশস্ততা এবং পরিকল্পনার অভাব। এছাড়া, অবৈধ দখল, রাস্তার পাশে হাটবাজার এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
বাংলাদেশের সড়ককে নিরাপদ করার পথটি মোটেও মসৃণ নয়। এর পেছনে বহুবিধ অন্তরায় বিদ্যমান। আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগের অভাব সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কিছু সদস্যের উদাসীনতা আইনকে অকার্যকর করে রেখেছে। ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন এবং লাইসেন্সবিহীন চালকের বিরুদ্ধে যে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা, তা অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনগুলোর অনৈতিক প্রভাব এবং যে কোনো নিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তাদের সংঘবদ্ধ প্রতিরোধ সড়ক ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা। ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়ায় দুর্নীতি এবং দক্ষতা পরীক্ষা না করে লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এর ফলে অদক্ষ চালক খুব সহজেই ভারী যানবাহন চালানোর অনুমতি পেয়ে যাচ্ছে। আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার অভাব, যেমন স্বায়ংক্রিয় সংকেত ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা দ্বারা পর্যবেক্ষণ এবং রিমোট কন্ট্রোলের মাধ্যমে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের অপ্রতুলতাও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে।
সর্বোপরি, সড়ক ব্যবহারকারী হিসেবে আমাদের নিজেদের সচেতনতার অভাব এবং আইন মেনে চলার প্রতি চরম অনীহা এই সমস্যাকে জিইয়ে রেখেছে। ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে ঝুঁকি নিয়ে রাস্তা পার হওয়া, জেব্রা ক্রসিং না মানা, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো— এগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের খুবই পরিচিত দৃশ্য। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও বহুস্তরীয় কর্মপরিকল্পনা। প্রথমত, ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’-এর সকল ধারার কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক চাপ যেন আইন প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত ও স্বচ্ছ করতে হবে এবং চালকদের জন্য নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে। তৃতীয়ত, যানবাহনের ফিটনেস পরীক্ষাকে আধুনিক ও ডিজিটাল পদ্ধতির আওতায় এনে কোনোভাবেই যেন ফিটনেসবিহীন যানবাহন রাস্তায় নামতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, দেশের সকল মহাসড়ককে পর্যায়ক্রমে চার বা ছয় লেনে উন্নীত করে ধীর ও দ্রুতগতির যানবাহনের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করতে হবে। পঞ্চমত, পথচারীদের নিরাপদে রাস্তা পারাপারের জন্য পর্যাপ্ত ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস ও জেব্রা ক্রসিং নির্মাণ করতে হবে এবং এর ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে হবে। ষষ্ঠত, পাঠ্যপুস্তক ও সকল গণমাধ্যমে সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে শিশুকাল থেকেই ট্রাফিক আইন মেনে চলার মানসিকতা গড়ে ওঠে।
পরিশেষে, সড়ক দুর্ঘটনাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে না দেখে, একে একটি জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে গণ্য করে সরকার, পরিবহন মালিক-শ্রমিক, যাত্রী, পথচারী এবং সুশীল সমাজ সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ খুঁজে বের করতে হবে। ২২ অক্টোবরের অঙ্গীকার হোক, আর একটিও প্রাণ যেন সড়কে অকালে ঝরে না যায়, আর কোনো পরিবার যেন স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব না হয়।
নিরাপদ সড়ক আমাদের অধিকার, আর এই অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমাদের সকলকেই হতে হবে সোচ্চার ও দায়িত্ববান।

আব্দুল্লাহ সাহেদ : ব্যাংকার, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন