শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

ভ্রমণ কাহিনী

নীল তরঙ্গে তাসীনের স্মৃতি
তৌফিকুল ইসলাম

জীবনের প্রতিদিনই একেকটা রুটিন, একেকটা ব্যস্ততার বৃত্ত। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ব্যবসার হিসাব, কাজের চাপ, মানুষের ভিড়, হাসি-রাগ-ক্ষোভ— সব মিলিয়ে দিনগুলো যেন একরকম যান্ত্রিক হয়ে উঠেছিল। এমন সময় মনে হলো, একটু বিরতি দরকার— নিজের জন্য, পরিবারের জন্য, প্রিয়জনদের হাসির জন্য। তাই হঠাৎই সিদ্ধান্ত নিলাম, এবারের ছুটিটা হবে সমুদ্রের কাছে— অসীম নীলের কোলে, কক্সবাজারে।
রাত তখন প্রায় ১২টা। শাটার নামিয়ে দোকান থেকে বের হচ্ছি। দিনের ব্যস্ততা শেষে ক্লান্ত শরীর, মাথায় এখনো ব্যবসার হিসাব ঘুরছে। নতুন অর্ডার, সরবরাহ, ডিজাইন— সব মিলিয়ে জীবনটা যেন কাজের ঘূর্ণিতে আবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। মনে হচ্ছিল, নিঃশ্বাসটা যেন ধাতুর গন্ধে ভারী হয়ে আছে।
হঠাৎ মনে হলো, এবার একটু দূরে যেতে হবে— সমুদ্রের কাছে। সেই ভাবনা মাথায় আসতেই যেন বুকের ভেতর হালকা বাতাস বয়ে গেল। বাড়ি ফিরে সহধর্মিণীকে বললাম,
—“চলো কোথাও যাই, একটু নির্ভার হই।”
উনি হেসে বললেন,
—“তাসীন আর তামিমেরও তো স্কুল ছুটি চলছে, এবার তাদের সমুদ্র দেখানো যাক।”
ছোট ছেলে তামিম উচ্ছ্বাসে লাফিয়ে উঠল, আর বড় মেয়ে তাসীন চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করল,
—“আমরা কি সত্যি কক্সবাজারে যাবো?”
আমি মাথা নেড়ে বললাম— “হ্যাঁ, এবার সমুদ্রের ঢেউ তোমাদের পা ছুঁয়ে যাবে।”
পরদিন ভোরে রওনা দিলাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে। ব্যবসার চিন্তা, ব্যস্ততা সবকিছু পেছনে ফেলে শুধু আনন্দ আর প্রত্যাশা সঙ্গে নিয়ে। বাস ছাড়ল ভোর ৬টায়। জানালার বাইরে ছুটে চলা গাছ, নদী আর পাহাড়ের দৃশ্য যেন মনকে নতুন করে বাঁচতে শিখাচ্ছে।
তাসীন জানালার ধারে বসে বলল— “আব্বু, দেখো ওই গাছগুলো দৌড়াচ্ছে!”
তামিম হেসে বলল— “না আপু, আমরা দৌড়াচ্ছি!”
এই ছোট্ট কথাবার্তায় ক্লান্ত মনটা যেন আনন্দে ভরে উঠল। সহধর্মিণী পাশে বসে চুপচাপ হেসে বললেন— “তুমি এতদিন শুধু কাজ করেছ, এবার একটু নিজের জন্যও বাঁচো।”
আমি বুঝলাম— জীবনের সবচেয়ে সুন্দর প্রশান্তি আসলে প্রিয়জনের মুখে এই শান্ত হাসি।
বিকেলে পৌঁছালাম কক্সবাজারে। বাস থেকে নামতেই নোনাজল মেশানো বাতাসে মনটা ভরে গেল। দূরে ঢেউয়ের গর্জন শুনে মনে হচ্ছিল কেউ ডাকছে— এসো, আমি তোমাদের অপেক্ষায় আছি।
হোটেলে ব্যাগ রেখে সরাসরি সৈকতের দিকে দৌড় দিল তামিম। পায়ের নিচে বালুর নরম স্পর্শ, সামনে অসীম নীল সমুদ্র। তাসীন বলল— “আব্বু, এত বড় পানি আমি জীবনে দেখিনি!”
আমি বললাম— “এই হলো পৃথিবীর দীর্ঘতম সৈকত, মা।”
সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে ডুবছে। রঙিন আকাশ, ঢেউয়ের গর্জন আর হালকা বাতাস— সবমিলিয়ে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব ক্লান্তি এই নোনাজলে মিশে যাচ্ছে। সহধর্মিণী চুপচাপ দাঁড়িয়ে সেই দৃশ্য দেখছিলেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম— আমরা আসলে সুখ খুঁজি না, কেবল ভালোবাসার উপস্থিতি খুঁজি।
রাতের কক্সবাজার যেন আরেক রূপকথা। আলো-আঁধারিতে ভরা সৈকতে বসে ভুট্টা খেলাম সবাই মিলে। তামিমের মুখে লবণজল আর হাসির মিশ্রণে যে দৃশ্য তৈরি হয়েছিল, সেটি এখনো মনে পড়লে হাসি পায়। এক ছোট ছেলে ঘুড়ি বিক্রি করছিল। আমি কিনে দিলাম। হাওয়ায় ছাড়তেই তাসীন বলল— “আব্বু, আমাদের ঘুড়ি সবচেয়ে উঁচুতে উড়ছে!”
হয়তো ও বুঝতে পারেনি— ওর সেই উড়ন্ত ঘুড়িটাই আমার জীবনের ক্লান্ত আকাশে নতুন আলো জ্বেলে দিল।

হিমছড়ির পাহাড়ে
পরদিন সকালে গেলাম হিমছড়ি। পথজুড়ে পাহাড়, পাথর আর ঝর্নার ধ্বনি। তাসীন আর তামিম দৌড়ে এগিয়ে যাচ্ছিল— কেউ পাহাড়ে উঠছে, কেউ ছবি তুলছে।
তাসীন বলল— “আব্বু, ভয় লাগে, কিন্তু ভালোও লাগে।”
আমি বললাম— “জীবনও এমন, ভয়ের মাঝেই আনন্দ লুকিয়ে থাকে।”
চূড়ায় উঠেই দেখা গেল নিচে নীল সমুদ্র, সূর্যের আলোয় ঝিলমিল করছে। সহধর্মিণী পাশে এসে বললেন— “তুমি সবসময় কাজ নিয়ে থাকো, আজ দেখ, কেমন লাগে প্রকৃতির কোলে!”
আমি শুধু বললাম— “মনে হচ্ছে, জীবন আবার শুরু হলো।”

ইনানী সৈকতের জাদু
বিকেলে গেলাম ইনানী সৈকতে। এখানকার পাথরগুলো যেন রঙিন রত্নের মতো। সূর্যের আলো পড়লে মনে হয়, পুরো সৈকত আগুনে ঝলমল করছে। তামিম ছোট ছোট পাথর কুড়িয়ে মায়ের হাতে দিচ্ছে, “এইটা তোমার জন্য মা।”
সহধর্মিণী হাসলেন— “এই পাথরটাই সবচেয়ে দামী উপহার।”
আমার মনে হচ্ছিল, এতদিন ব্যবসার হিসাব কষে কাটালেও এই মুহূর্তগুলোই জীবনের আসল লাভ।
রাতে হোটেলে খেলাম টাটকা সামুদ্রিক মাছ, চিংড়ি ভাজা আর ঝাল চাটনি। তাসীন মজা করে বলল— “আব্বু, চাঁপাইনবাবগঞ্জে এমন মাছ কোথায় পাবো?”
আমি হেসে বললাম— “তুমি বড় হলে আমরা খুলব ‘তাসীন সী-ফুড হাউস!’”
সবাই হেসে উঠল। সেই হাসিতেই যেন সুখের পূর্ণতা।

তৃতীয় দিনে ট্রলার ভাড়া করে গেলাম মহেশখালী। বাতাসে লবণের গন্ধ, নীল আকাশে পাখির উড়ান সবমিলিয়ে এক সিনেমার দৃশ্যের মতো। তামিম প্রথমে ভয় পেলেও আমি তাকে কোলে নিয়ে বললাম, “ভয় পেও না, সমুদ্র আমাদের বন্ধু।”
তাসীন ট্রলারের কিনারায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছিল। বলল— “আব্বু, এই ছবিটা আমরা দোকানের দেওয়ালে রাখব স্মৃতি হিসেবে।” মেয়ের কথায় বুকটা গর্বে ভরে গেল।
বিকেলে গেলাম সোনাদিয়া দ্বীপে। নির্জন, শান্ত, অথচ মায়াময় এক জায়গা। বালুর ওপর তাসীন লিখল, “আমরা একসাথে তাসীন পরিবার।” তামিম তা ঘষে দিয়ে বলল, “না, আমি লিখব— আমরা সমুদ্রের বন্ধু!”
সহধর্মিণী হেসে বললেন, “জীবনের সেরা দিন আজ।”
আমি তাঁর হাত ধরে চুপ করে রইলাম। এমন মুহূর্তে কোনো শব্দই যথেষ্ট নয়।

ফিরে আসা
চতুর্থ দিনের সকালে ফেরার সময় মনে হচ্ছিল, সমুদ্র যেন আমাদের চোখে জল এনে বিদায় জানাচ্ছে। তাসীন বলল, “আব্বু, আবার কবে আসব?”
আমি বললাম, “যখন ঢেউ ডাকবে, তখনই।”
বাসে ফেরার পথে জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকালাম। মনে হচ্ছিল, এই ক’দিনে সমুদ্র আমাদের শুধু আনন্দই দেয়নি, দিয়েছে নতুন জীবনবোধও।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে ফিরে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলতেই মনে হলো, এই দোকানও যেন আমার পরিবারেরই অংশ। এখানে আমি পরিশ্রম করি, স্বপ্ন দেখি, কিন্তু সেই স্বপ্নের জ্বালানি এখন সমুদ্রের ঢেউ থেকে পাওয়া অনুপ্রেরণা।
কক্সবাজার শুধু একটি ভ্রমণস্থান নয়— এ যেন জীবনের আয়না। যেখানে ঢেউ শেখায় দৃঢ়তা, সূর্যাস্ত শেখায় ধৈর্য, আর পরিবারের হাসি শেখায় জীবনের আসল মানে।
আমি ফিরেছি ব্যবসার ব্যস্ত জীবনে, কিন্তু সমুদ্রের গর্জন আজও মনে বাজে— “জীবন সুন্দর, যদি ভালোবাসা পাশে থাকে।”

তৌফিকুল ইসলাম : লেখক তাসীন মেটালিক ক্রেস্ট হাউসের স্বত্বাধিকারী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

শেয়ার করুন