প্রবাস জীবন : স্বপ্ন ও বাস্তবতা
এম.এ. মাহবুব
২০০৪ সালের কথা। টেলিকমিউনিকেশন ব্যবসার সাথে যুক্ত থাকার দরুন প্রবাসীদের সুখ-দুঃখের নানা ঘটনা জানার সুযোগ হয়েছিল। হরহামেশাই জেলার বিভিন্ন এলাকার প্রবাসীদের আত্মীয়-স্বজনরা আমার দোকানে আসত ফোন-ফ্যাক্স বা ইমেইল করার জন্য। সেই সময় মোবাইল ফোন বা ইন্টারনেট এতটা সহজলভ্য হয়নি। প্রথম দিকে টিঅ্যান্ডটির ইন্টরনেট লাইন ব্যবহার করে ইমেইল পাঠাতাম। দীর্ঘদিন বিদেশ থেকে বাড়ি না আসায় বাড়িতে এই সমস্যা-সেই সমস্যা লিখে কোম্পানিতে ফ্যাক্স পাঠাত প্রবাসীদের স্বজনরা, যাতে কোম্পানি অন্তত কিছু দিনের জন্য ছুটি দেয়। যখন শুনতাম তিন-চার বছর হয়ে গেছে, বিদেশ যাওয়ার পর একবারও বাড়ি আসেনি প্রবাসে থাকা লোকটি, তখন মনের অজান্তেই গালি কিম্বা ভর্ৎসনা করে ফেলতাম কখনো কখনো। ভাবতাম পরিবার-পরিজন ফেলে কিভাবে একটা মানুষ এতবছর বিদেশে থাকতে পারে। দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে ঘরবাড়ি, দোকানপাটসহ নানা সম্পত্তির মালিক হওয়া লোকটির পুনরায় বিদেশ যাওয়ার ঘটনাও দেখেছি, যা আরো ক্ষুব্ধ করত মনকে।
নিয়তির কি পরিহাস! সেই আমাকে বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য আর সাংবাদিকতা ছেড়ে প্রবাসজীবন গ্রহণ করতে হয়। ব্যবসার পাশাপাশি সাংবাদিকতা করে মোটামুটি চলে যাচ্ছিল। কিন্তু ব্যবসা শুরুর প্রথম দিকের কয়েক বছরের ক্রমাগত ঘাটতির জের ক্রমেই বেড়ে চলছিল; যা কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব হচ্ছিল না। পরে ২০১৯ সালের ৯ জানুয়ারিতে দক্ষিণ কোরিয়ার অভিবাসন গ্রহণ করি। পরিকল্পনা ছিল, ৫ বছর শেষ করে দেশে গিয়ে আবার কিছু একটা করবো। যাত্রার সকল প্রস্তুতি শেষ করে বিমানে চেপে বসার পর যখন বিমানটি আকাশে উড়াল দিল তখন মনে হচ্ছিল, ভেতরটা যেন ভেঙে যাচ্ছে। চিৎকার করে কান্না করতে হচ্ছে হলেও পারিনি।
আমার কোম্পানিটি কোরিয়ার রাজধানী সিউল থেকে ১ ঘণ্টার পথ। কোম্পানিতে আসার পর খবর পেয়ে পাশের শহরে থাকা রাজারামপুর এলাকার মাসুদ রানা ভাই ও সাথে সোহেল রানা ভাই আসেন আমার সাথে দেখা করতে। সেটি যেন আমার কাছে মরুভূমিতে পানি পাওয়ার মতো ছিল। মাসুদ ভাই খুব সজ্জন মানুষ ছিলেন। কিছুদিন পর কথা প্রসঙ্গে তাকে বলেছিলাম ৫ বছর থেকে চলে যাবো। মাসুদ ভাই বলেছিলেন, “যা বললেন-বললেন, আর কাউকে বলিয়েন না। এমন কথা সবাই বলে, আমিও বলেছিলাম, এখন ১২ বছর চলে।”
বর্তমানে আমারও ৬ বছর শেষ। প্রবাসজীবনের কখন শেষ হবে, এখনো অনিশ্চিত। এর মধ্যে কয়েকবার দেশে গিয়েছি। সবাই বলে, দেশে এসে কি করবেন, ওখানেই ভালো আছেন।
সে যাই হোক, দক্ষিণ কোরিয়ায় আসার আগে এই দেশ সম্পর্কে ‘স্বপ্নের দেশ’ কথাটি অনেকবার শুনেছি। বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে তার কিছু নমুনাও মেলে। পরিচ্ছন্ন রাস্তাঘাট আর পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে আকাশে উঁকি দেয়া বিশাল বিশাল দালান-কোঠাÑ সব মিলিয়ে ছোট ছোট শহরগুলোকে ছবির মতাই মনে হয়েছে। আরো আশ্চর্য হয়েছি, যখন দেখেছি সারাদিন কামলাখাটা একটা মানুষ দিন শেষে বিএমডব্লিউ, মার্সিডিজ কিংবা দামি কোনো গাড়ি করে বাড়ি ফিরছে।
এখানে এসে প্রথম যে সমস্যায় পড়ি তা হলো এ দেশের ভাষা। কোম্পানিতে আগে থেকে থাকা এক দেশী ভাইয়ের সহযোগিতায় কাজের ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা হলেও কালা-বোবা হয়ে পার করতে হয় বেশ কিছু সময়। এমন পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে ভাষার ক্লাস শুরু করি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই। সে আরেক বিপত্তি, শিক্ষকও কোরিয়ান। মাঝে মাঝে আধো আধো ইংরেজি ব্যবহার করায় কিছুটা রক্ষা হয়।
শুরু হয়, জীবনের এক নতুন অধ্যায়। ৮টা-৬টা কাজ করে এসে রান্নবান্না, গোসল, নামাজ, পরিবারের সাথে যোগাযোগ, ঘুম আবার সকাল হলেই কাজ। সপ্তাহ শেষে রবিবারের ছুটিতে বাজার করা এদিক-সেদিক একটু যাওয়া-আসা। এরপর রাত পেরোলেই আবার শুরু হয় নতুন সপ্তাহের পুরাতন রুটিন। কেমন যেন একটা চক্রের মধ্যে আটাকে যায় জীবন। রাতে কোম্পানির দেয়া ছোট ঘরটিতে আলো নিভিয়ে ঘুমানোর সময় মনে হতো যেন কবরের মধ্যে শুয়ে আছি। তবে এখানে কর্মক্ষেত্রের একটা বিষয়, যা আমাকে মুগ্ধ করে তা হলো, কাজের ক্ষেত্রে পদ-পদবি বা দায়িত্ব বণ্টন থাকলেও দিন শেষে সবার মর্যদা সমান। মালিক-শ্রমিক একসাথে আড্ডা দেয়া, খাওয়া-দাওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার এখানে।
সপ্তাহ শেষে ছুটির দিন ভাষার ক্লাস করতে গিয়ে কোরিয়ানদের ভাষা, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, ইতিহাস-ঐতিহ্য ইত্যাদি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা তৈরি হয় যা কর্মক্ষেত্রে কোরিয়ান সহকর্মীদের সাথে কথোপকথন বা ভাব বিনিময়ে খুব বড় ভূমিকা পালন করে। অপরদিকে কর্মেক্ষেত্রে নিজের অবস্থান তৈরিতেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা থেকে দূরে থাকলেও পারিপাশির্^ক অবস্থা সম্পর্কে জানাশোনা বা খোঁজখবর রাখার অভ্যেসটা এখনো পুরোপুরি যায়নি বলতে পারেন। আর সে কারণে যে দেশে থাকছি, সেখানকার মানুষের জীবন ও প্রকৃতি নিয়ে কৌতূহলও কম ছিল না। প্রথমদিকে খুব একটা বোঝার সুযোগ না হলেও ধীরে ধীরে যে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে ওঠে তা হলো, আমরা যাকে আলো মনে করি তা এক ধরনের আলোকিত অন্ধকার। স্বাধীন ও বিলাসী জীবনের হাতছানি এ দেশের মানুষকে সামাজিক জীব থেকে সামাজিক যন্ত্রে পরিণত করেছে।
২০-২৫ বছর আগেও দক্ষিণ কোরিয়ার পারিবারিক ভিত্তি ও জীবনযাপনের ধরন অনেকটা আমাদের দেশের মতোই ছিল। একান্নবর্তী পরিবার, সামাজিক রীতি-রেওয়াজ, প্রেম-প্রীতি, ভালোবাসা, পারস্পারিক নির্ভরতা, বিশ্বাস সবকিছুরই মিল ছিল। অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে পাল্লা দিয়ে পরিবর্তন আসে ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনেও। আধুনিক জীবনের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে রক্তে-মাংসে গড়া মানুষ পরিণত হয়েছে মানবযন্ত্রে। উন্নত জীবনের পেছনে ছুটতে গিয়ে এখন ক্রমেই বিলুপ্ত হতে চলেছে এ দেশের পারিবার প্রথা। যার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জনসংখ্যার ওপরেও। এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে ৫ কোটি ১৮ লাখের জনসংখ্যা একবিংশ শতাব্দীর শেষ নাগাদ নেমে আসবে ২ কোটি ৮০ লাখে। প্রকৃত কারণ হিসেবে যেটিকে চিহ্নিত করা যায় তা হলো, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে একদিকে যেমন মানুষের আধুনিক জীবনযাপনের অভ্যেস তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে জীবনযাপনের ব্যয়ও বড়েছে বহুগুণ। যে কারণে এখন একজন মানুষের আয় দিয়ে একটি আধুনিক পরিবারের ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। সে কারণে বিয়েতে অনাগ্রহ বাড়ছে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে। কেউ কেউ বিয়ে করলেও স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই কাজ করতে হয়। প্রেক্ষিতে সন্তান জন্মদান, লালন-পালন এসবের ঝামেলা এড়িয়ে যেতে চান অধিকাংশরা। ব্যতিক্রম যে নেই সেটা নয়, তবে ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই।
অন্যদিকে আমাদের মতো যারা নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তনের আশায় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ভিনদেশে পাড়ি জমান, তাদের স্বপ্ন ও বাস্তবতার মধ্যে আকাশজমিন ব্যবধান রয়েই যায়। বিদেশে না এলে বা এসব বিষয় নিজের জীবনের সাথে জড়িয়ে না গেলে হয়তো এসব বিষয় আমার নিজের উপলব্ধিতেও আসত না। বিদেশে এসে মোটামুটি যাদের সাথে এসব বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেছি, সামান্য কমবেশি সকলের উপলব্ধি প্রায় একই। ভাগ্যের পরিবর্তনের আশায় যারাই বিদেশে পাড়ি জমান, ব্যতিক্রম ছাড়া সবার পরিণতিও হয় একই রকম।
ইউরোপগামীরা ছাড়া অন্যান্য দেশে অভিবাসন গ্রহণকারীদের সাধারণত এই চিন্তা থাকে যে, বিদেশে থেকে কিছু টাকাপয়সা উপার্জন করে দেশে গিয়ে মোটামুটি কিছু একটা করার। কিন্তু বিদেশের মাটিতে পা রাখার অল্প কিছুদিন পরই সেই চিন্তায় ছেদ পড়ে। বেশিরভাগ মানুষই একটা ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই দেশ ছাড়ে। সেই ঋণ শোধ হতে না হতেই হাজির হয় নতুন চাহিদা, নতুন সমস্য। একটা সমাধান হতে না হতেই হাজির হয় আরেকটা। যে লোকটা দেশে থাকতে ১০ হাজার টাকায় সংসার চালাত, তার সংসার এখন ৩০ হাজার টাকাতেও চলে না। তার ওপর যোগ হয়, জমি-জমা, বাড়ি-ঘর কিংবা কিছু সম্পদ জমানোর চিন্তা, যাতে দেশে গিয়ে বাকি জীবনটা স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারে। নিত্যদিনের চাহিদা পূরণের পর যা কিছু বাঁচে, তা দিয়ে নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। বাড়তে থাকে চাহিদা, বাড়তে থাকে সময়। জীবনের সোনালী সময় শেষ হয় শুধুমাত্র পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিতেই। এমন লোককেও দেখেছি যিনি সামনের বছর, সামনের বছর করে ২৫ বছর ধরে দেশে যেতে পারেননি তার পরিকল্পনা পূর্ণ হয়নি বলে। কিছু মানুষ সারা জীবনের উপার্জন দেশে পাঠিয়ে মৃত্যুর পর তার কফিনটিও নিতে রাজি হয়নি তার পরিবার কিছু টাকা পাঠাতে হবে বলে।
বিদেশ থেকে ফিরে ভাগ্য পরিবর্তনের গল্প রয়েছে অনেক, তবে শতকরা হিসাবে তা অতি নগণ্য। দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে প্রবাসীদের সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ থাকলেও প্রবাসীদের আর্থসামাজিক উন্নয়ন থেকে যায় ধরাছোয়ার বাইরে। প্রবাসীরা রক্তপানি করে যে টাকা দেশে পাঠান, সেই টাকা অসাধু রাজনীতিবিদ, আমলা আর ব্যবসায়ীরা মিলে পাচার করেন। যাদের টাকায় দেশ চলে, দেশে যাওয়ার সময় তাদেরকে বিমানবন্দরেই হয়রানির শিকার হতে হয় অহরহ। সবকিছু ছাপিয়ে প্রবাসীদের একটাই চাওয়া, দেশে নিরাপদ বিনিয়োগের পরিবেশ। যাতে দেশে ফিরে ছোটখাটো হলেও কিছু একটা করে বাকি জীবনটা চালিয়ে নেয়া যায়।
এম.এ. মাহবুব : প্রবাসী, গণমাধ্যমকর্মী