শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

বরেন্দ্রভূমির রঙ ও স্মৃতি
তৌফিকুল ইসলাম

সপ্তাহের ছুটির দিনটা সাধারণত একটু ঘুরাঘুরি করে কাটাতে ভালোবাসি। শহরের কোলাহল থেকে দূরে কোথাও গেলে মনটা হালকা লাগে, মনে হয় নিঃশ্বাসটা যেন একটু মুক্তি পায়। এইরকম একদিন ছুটির দিন শুক্রবার সকালে ব্যাগে এক বোতল পানি আর একটা ছোট নোটবুক নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাচোলের পথে, বরেন্দ্রভূমির সেই ইতিহাসঘেরা জনপদে।
এই সফরে তিনটি গন্তব্য— আল্পনা গ্রাম, শুড়লা গ্রামের ৫০০ বছরের পুরোনো তেঁতুল গাছ, আর ইলা মিত্র স্মৃতি সংগ্রহশালা।

আল্পনার রঙে রঙিন টিকইল গ্রাম
নাচোল উপজেলার নেজামপুর ইউনিয়নের টিকইল গ্রাম এ যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস। এ গ্রামের প্রায় ৯০টি হিন্দু পরিবারে চার শতাধিক মানুষের বসবাস। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো— গ্রামের প্রায় প্রতিটি নারীই একজন চিত্রশিল্পী!
গ্রামে ঢুকতেই চোখে পড়ল রঙে রঙে সাজানো বাড়িঘরগুলো। দেয়াল, মেঝে, রান্নাঘর, এমনকি শোবার ঘরের দেওয়ালও আল্পনায় ভরা। বাদ যায়নি গোয়ালঘরটিও। মনে হচ্ছিল, যেন কোনো শিল্প প্রদর্শনী চলছে। অথচ এটি একটি সাধারণ গ্রাম।
আগে মাত্র কয়েকটি বাড়িতে আল্পনা আঁকা হতো। এখন সব বাড়ির বৌ-ঝিরাই আল্পনা আঁকে। এলাকাবাসীর তথ্য মতে, বছরে দুইবার লক্ষ্মীপূজা আর দুর্গাপূজায় পুরো গ্রাম সাজানো হয়।
প্রভাতী রানী একজন জানালেন, আগে আল্পনা আঁকতে লাল মাটি, খড়িমাটি, চাল ভিজিয়ে বানানো সাদা রং ও গাছের কষ ব্যবহার করা হতো। এখন বাজারের রং ব্যবহৃত হয়, কিন্তু আবেগটা একই রকম।
প্রায় দেড়শ বছর ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য এখন সারাদেশের মানুষ চেনে ‘আল্পনা গ্রাম’ নামেই।
গ্রামের সরু পথ ধরে হাঁটতে এক বাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে দেখলাম, এক নারী মাটির দেয়ালে সাদা রঙে সূর্য, চাঁদ আর ফুলের নকশা আঁকছেন। পাশে তার ছোট মেয়ে রঙ মেশাতে সাহায্য করছে। এমন দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছিল, সময় যেন থেমে আছে শুধু রঙ আর তুলির ছোঁয়ায়, বয়ে যাচ্ছে জীবন।
আল্পনা গ্রাম ঘোরা শেষে রওনা দিই শুড়লা গ্রামের পথে। পথ শেষে চোখে পড়ল এক মহীরূহ পাঁচশ বছরের পুরোনো তেঁতুল গাছটি। গাছটি শুধু প্রকৃতির অংশ নয়, এটি ইতিহাসের সাক্ষী। স্থানীয়দের মতে, ১৮৫৫ সালের সাঁওতাল বিদ্রোহ ও ১৯৪৬ সালের তেভাগা আন্দোলনের সময় এই গাছের নিচেই জড়ো হতো মানুষ!
গাছের উচ্চতা প্রায় দেড়শ ফুট, ডালপালা ছড়িয়ে গেছে আট কাঠা জায়গাজুড়ে। এর ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে মানুষ, গাছে বাসা বেঁধেছে বক, শালিক, ফিঙে ও নানা অতিথি পাখি।
গাছের নিচে দাঁড়িয়ে বাতাসে চোখ বুজে ভাবছিলাম, এই গাছ কত গল্প জানে! কত মানুষের আসা-যাওয়া, লড়াই আর পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে সে এখনো দাঁড়িয়ে আছে অবিচলভাবে।
শুড়লা থেকে যায় রাওতাড়া গ্রামে, ইলা মিত্র স্মৃতি সংগ্রহশালা দেখতে। রাস্তার দুই ধারে তাল, খেজুর আর আমগাছের সারি। পৌঁছে গেলাম ইলা মিত্র স্মৃতি সংগ্রহশালায়। জানা যায়, ২০২৪ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এর উদ্বোধন হয়।
সংগ্রহশালাটি নির্মিত হয়েছে ইলা মিত্র মঠের পাশে, প্রায় ০.২৬ একর জায়গায়। প্রকৌশলী শাহিনুল ইসলামের ডিজাইনে মাটি ও কাঠ দিয়ে তৈরি এই দুইতলা ভবনটি যেন এক শিল্পকর্ম। সামনে কাঠের সিঁড়ি, বারান্দায় বসে দূরের মাঠ দেখা যায়। পুরো পরিবেশটাই গ্রামীণ সৌন্দর্যে ভরা।
ভেতরে প্রবেশ করতেই ইতিহাসের স্পর্শ পেলাম। দেয়ালে তেভাগা আন্দোলনের ছবি, ইলা মিত্রের ব্যবহৃত সামগ্রী, চিঠি ও দলিলপত্র সাজানো। গাইড বললেন, “১৯৪৮-৪৯ সালে ইলা মিত্রের নেতৃত্বেই নাচোলে তেভাগা আন্দোলন হয়েছিল। এই সংগ্রহশালা তাঁর সেই সংগ্রামী ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে।”
সংগ্রহশালার পাশে একটি ছোট মাটির ঘর পর্যটকদের বিশ্রামের জন্য তৈরি করা হয়েছে। আশপাশে বনায়ন প্রকল্পের সবুজ ছায়া পুরো জায়গাটিকে আরো শান্ত করেছে।
ভ্রমণের শেষ প্রহরে বিকেলের শেষ আলোয় যখন সূর্য ধীরে ধীরে পশ্চিমে ঢলে পড়ছিল, তখন দাঁড়িয়ে ছিলাম ইলা মিত্র স্মৃতি সংগ্রহশালার উঠোনে। দূরে বক উড়ছে, কোথাও গরুর ঘণ্টার শব্দ, আর বাতাসে নাচছে ধানের শীষ।
মনে হচ্ছিল, আজকের দিনটা শুধু ভ্রমণ নয় এ যেন ইতিহাস, সংস্কৃতি আর প্রকৃতির এক মিলনযাত্রা।
আল্পনা গ্রাম আমাকে শিখিয়েছে রঙের ভাষা, শুড়লার তেঁতুল গাছ শোনাল ইতিহাসের গল্প, আর রাওতাড়ার ইলা মিত্র সংগ্রহশালা মনে করিয়ে দিল সংগ্রামের শক্তি।
ফিরতি পথে মনে হচ্ছিল— “এই নাচোল শুধু একটি উপজেলা নয়, এটি এক জীবন্ত ইতিহাসের বই, যার প্রতিটি পৃষ্ঠা রঙে, মাটিতে ও মানুষের স্মৃতিতে লেখা।”
ফেরার পথে ভাবছিলাম পরের ছুটির দিনে আবার এমন কোনো গল্পময় পথে হাঁটব, যেখানে ইতিহাস আর মানুষ একসাথে বেঁচে থাকে।

তৌফিকুল ইসলাম : সম্পাদক, স্বর্ণালী সাহিত্য পরিষদ এবং স্বত্বাধিকারী তাসীন মেটালিক ক্রেস্ট হাউস অ্যান্ড ডিজিটাল প্রিন্টিং, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

শেয়ার করুন