শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রাসঙ্গিক ভাবনা
আব্দুল্লাহ্ সাহেদ

আজ ১৬ অক্টোবর বিশ্ব খাদ্য দিবস। খাদ্য আমাদের মৌলিক চাহিদা। তবে ফিলিস্তিনের গাজায় সে মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। যখন গাজার শিশুরা অনাহারে কঙ্কালসার হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে, তখন বিশ্বের অন্য প্রান্তে বিলাসবহুল রেস্তোরাঁর ডাস্টবিনে উপচে পড়ছে উদ্বৃত্ত খাবার। মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন নির্মম ও নির্লজ্জ বৈপরীত্য হয়তো আর দ্বিতীয়টি নেই। এই বৈশ্বিক ক্ষুধা, অপুষ্টি এবং খাদ্য ব্যবস্থার গভীর অসামঞ্জস্যকে সামনে এনে বিশ্ববিবেককে জাগ্রত করার লক্ষেই আজকের এই দিবস।
দিবসটির শুরু হয়েছিল মূলত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (Food and Agriculture Organization-FAO)-এর প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণ করে। ১৯৪৫ সালের এই দিনেই, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের পটভূমিতে, বিশ্বকে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত করার মহৎ লক্ষ্য নিয়ে সংস্থাটি আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে, ১৯৭৯ সালে FAO-এর ২০তম সাধারণ অধিবেশনে হাঙ্গেরির তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ড. পল রোমানি এই দিবসটি উদ্যাপনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব করেন। সেই থেকে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে, যার মূল উদ্দেশ্য হলো বিশ্বব্যাপী খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের সংগ্রামকে জোরদার করা এবং ক্ষুধা ও অপুষ্টির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণে সব দেশকে উৎসাহিত করা।
খাদ্য নিরাপত্তা কেবল পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন বোঝায় না; এর চারটি প্রধান স্তম্ভ রয়েছে— খাদ্যের প্রাপ্যতা (Availability), খাদ্য প্রাপ্তির সক্ষমতা (Access), খাদ্যের ব্যবহার বা পুষ্টি (Utilization) এবং এই সবকিছুর স্থিতিশীলতা (Stability)। আজকের বিশ্বে, বিশেষ করে গাজা উপত্যকায়, এই চারটি স্তম্ভ একযোগে ভেঙে পড়েছে। ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (IPC)-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বারবার সতর্ক করেছে যে, গাজা একটি সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের মধ্যে বসবাস করছে। সেখানে লাখ লাখ মানুষ, বিশেষত নারী ও শিশুরা, তীব্র অপুষ্টির শিকার। কৃষি জমি ধ্বংস করা হয়েছে, বেকারি ও খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, এবং বিশুদ্ধ পানির সরবরাহ একবারেই বন্ধ। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তেনিও গুতেরেস এই পরিস্থিতিকে ‘মানবতার প্রতি অবমাননা’ বলে অভিহিত করেছেন।
কিন্তু গাজা একা নয়; এই খাদ্য সংকট এক বৈশ্বিক মহামারির রূপ নিয়েছে। আফ্রিকার শিং (Horn of Africa), বিশেষত সোমালিয়া, ইথিওপিয়া ও কেনিয়ার লাখ লাখ মানুষ বিগত কয়েক দশকের সবচেয়ে ভয়াবহ খরার কবলে পড়ে বাস্তুচ্যুত ও ক্ষুধার্ত। জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাবে তাদের পালিত পশু ও আবাদি জমি ধ্বংস হয়ে গেছে। অন্যদিকে, সুদানের গৃহযুদ্ধ দেশটির খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছে। সাহেল অঞ্চলে সংঘাত, অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং মরুকরণের ফলে কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন খাদ্য সংগ্রহের সংগ্রামে লিপ্ত।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ৭৮৩ মিলিয়ন মানুষ, অর্থাৎ প্রতি দশজনের একজন, জানে না তাদের পরবর্তী বেলার খাবার কোথা থেকে আসবে। এই পরিসংখ্যানের আড়ালে লুকিয়ে আছে কোটি কোটি নীরব কান্না আর ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সংকটের মূল কারণ খাদ্যের অভাব নয়, বরং এর বণ্টন ও প্রাপ্যতার চরম অসামঞ্জস্যতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব।
এই বৈশ্বিক ক্ষুধার্ত বাস্তবতার ঠিক উল্টো পিঠেই রয়েছে খাদ্য অপচয়ের এক অকল্পনীয় এবং অনৈতিক চিত্র। একবিংশ শতাব্দীর সবচেয়ে বড় প্যারাডক্স সম্ভবত এটিই। একদিকে কোটি কোটি মানুষ অনাহারে, অন্যদিকে বিলিয়ন বিলিয়ন টন খাবার ফেলা হচ্ছে ভাগাড়ে। জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি UNEP)-এর ‘ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২৪’ অনুযায়ী, ২০২২ সালে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.০৫ বিলিয়ন টন খাদ্য অপচয় হয়েছে, যা বিশ্বব্যাপী উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। এই অপচয়কৃত খাদ্যের পরিমাণ দৈনিক হিসাবে দাঁড়ায় প্রায় ২.৮ মিলিয়ন টন। ভাবুন, যে পরিমাণ খাবার আমরা প্রতিদিন ফেলে দিচ্ছি, তা দিয়ে বিশ্বের সমস্ত ক্ষুধার্ত মানুষকে একাধিকবার খাওয়ানো সম্ভব। এই অপচয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই ঘটে গৃহস্থালি পর্যায়ে, বাকিটা ঘটে খাদ্য পরিষেবা (Food Service) এবং খুচরা বিক্রয় (Retail) পর্যায়ে। দুঃখজনকভাবে, খাদ্য অপচয়ের এই প্রবণতা ধনী-গরিব সব দেশেই বিদ্যমান। উন্নত দেশগুলোতে অপচয় বেশি হয় ভোক্তাপর্যায়ে (Consumer level), অর্থাৎ মানুষ প্রয়োজনের অতিরিক্ত কিনে বা খেতে না পেরে ফেলে দেয়। অন্যদিকে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অপচয়ের বড় অংশটি ঘটে ‘ফসলোত্তর ক্ষতি’ (Post-harvest Loss) হিসেবে অর্থাৎ দুর্বল সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অনুন্নত পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ার ত্রুটির কারণে ফসল মাঠ থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত পৌঁছানোর আগেই পচে যায় বা নষ্ট হয়। খাদ্য অপচয়ের বিষয়টি মুসলিম দেশগুলোর প্রেক্ষাপটেও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েতের মতো উপসাগরীয় ধনী দেশগুলোতে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের হার বিশ্বের সর্বোচ্চ। বিশেষ করে রমজান মাসে ইফতারের সময় বা বিভিন্ন বিবাহ ও সামাজিক অনুষ্ঠানে আতিথেয়তার নামে যে পরিমাণ খাবার তৈরি ও পরিবেশন করা হয়, তার একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত ডাস্টবিনে যায়। এটি ইসলামের মূল শিক্ষা, যা ‘ইসরাফ’ বা অপচয়কে কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত করে, তার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
এই বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং। বিগত পাঁচ দশকে বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে এক নীরব বিপ্লব সাধন করেছে, বিশেষ করে ধান, মাছ এবং সবজি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন বেশ প্রশংসনীয়। একসময় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে আখ্যায়িত দেশটি আজ খাদ্য রপ্তানিকারক দেশের তালিকায় নাম লেখানোর স্বপ্ন দেখছে। আমাদের কৃষিবিজ্ঞানী, সম্প্রসারণকর্মী এবং সর্বোপরি কঠোর পরিশ্রমী কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এটি সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালেও লুকিয়ে আছে নানা অন্তরায় ও নতুন চ্যালেঞ্জ। প্রথম এবং প্রধান অন্তরায় হলো জলবায়ু পরিবর্তন। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। দক্ষিণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ হাজার হাজার হেক্টর কৃষি জমিকে বন্ধ্যা করে দিচ্ছে। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা অঞ্চলের কৃষকরা তাদের ঐতিহ্যবাহী ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি চাষে বাধ্য হচ্ছেন, যা খাদ্য নিরাপত্তার চেয়ে রপ্তানি আয়ের দিকে বেশি ঝুঁকেছে। আবার, দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে (সিলেট, সুনামগঞ্জ) আকস্মিক বন্যা বা পাহাড়ি ঢল প্রতি বছর বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতি করে। দ্বিতীয়ত, আমাদের ফসলোত্তর ক্ষতির পরিমাণ বিপুল। বিশেষ করে ফল ও সবজির মতো পচনশীল দ্রব্যের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর মূল কারণ হলো, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার (যেমন— কোল্ড স্টোরেজ) অপর্যাপ্ততা, দুর্বল সাপ্লাই চেইন ম্যানেজমেন্ট এবং অনুন্নত পরিবহন ব্যবস্থা। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের একটি বড় অংশ বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হতে দেখেন। তৃতীয়ত, বাজার ব্যবস্থার অস্থিতিশীলতা। প্রায়ই দেখা যায়, একটি অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশছোঁয়া করে তোলে। এতে কৃষক তার পণ্যের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন, আবার ভোক্তাকেও উচ্চমূল্যে তা কিনতে হয়। এই মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য খাদ্য ব্যবস্থায় সুষম বণ্টনের পথে বড় বাধা। চতুর্থত, পুষ্টি নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জ। আমরা হয়তো ভাতের মাধ্যমে ক্যালোরির চাহিদা পূরণ করতে পেরেছি, কিন্তু ‘নীরব ক্ষুধা’ বা মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের (ভিটামিন, খনিজ লবণ) অভাব এখনো প্রকট।
তাই বাংলাদেশের করণীয় হওয়া উচিত বহুমাত্রিক। জলবায়ু-সহিষ্ণু ও উচ্চ ফলনশীল (যেমন— লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল) ফসলের জাত উদ্ভাবনে গবেষণা ও বিনিয়োগ বহুগুণ বাড়াতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং ‘কোল্ড চেইন’ ব্যবস্থা শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে ফসলোত্তর ক্ষতি কমিয়ে আনতে হবে। বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও মনিটরিং জরুরি। পাশাপাশি, শুধু ভাতের ওপর নির্ভর না করে খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য আনা এবং পুষ্টিকর খাদ্য (ডাল, দুধ, ডিম, ফল) উৎপাদনে কৃষকদের প্রণোদনা দিতে হবে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে আরেকটি নীরব ঘাতক খাদ্যে ভেজাল। উৎপাদন থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি স্তরে অসাধু ব্যবসায়ীরা অধিক মুনাফার লোভে খাদ্যে মেশাচ্ছেন বিষ। মাছে ফরমালিন, দুধে মেলামাইন, ফলে কার্বাইড ও ইথিলিন, মসলায় ইটের গুঁড়া, মুড়িতে ইউরিয়া এবং মিষ্টি ও সসে টেক্সটাইল ডাইয়ের মতো মারাত্মক ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার আজ এক ওপেন সিক্রেট। এই ভেজাল খাদ্যের প্রভাবে দেশে ক্যান্সার, কিডনি অকেজো, লিভার সিরোসিস, হৃদরোগ এবং শিশুদের স্নায়ুতন্ত্রের জটিল রোগের প্রকোপ আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা একে ‘স্লো পয়জনিং’ বা ধীরগতির বিষক্রিয়া বলে অভিহিত করেছেন। এটি কেবল বাংলাদেশেই নয়, চীন, ভারতসহ অনেক দেশেই একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বা বিএসটিআইয়ের অভিযান চললেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এই ভেজালের প্রবণতা রোধ করতে না পারলে, আমাদের খাদ্য উৎপাদনের সমস্ত অর্জনই অর্থহীন হয়ে পড়বে।
বিশ্ব খাদ্য দিবসে আমাদের এই বহুমুখী সংকট থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে গতানুগতিক চিন্তাধারার বাইরে এসে বৈপ্লবিক পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। প্রথমত, আমাদের টেকসই কৃষিব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে হবে। ‘সবুজ বিপ্লবে’র নামে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার মাটির উর্বরতা নষ্ট করেছে এবং পরিবেশের ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে। এর পরিবর্তে আমাদের ‘এগ্রো-ইকোলজি’ (Agro ecology) বা পরিবেশবান্ধব সমন্বিত কৃষি, পারমাকালচার, এবং জৈব সারের ব্যবহারে মনোযোগী হতে হবে। দ্বিতীয়ত, পানি ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন। কৃষি সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ (Rainwater Harvesting) এবং ড্রিপ ইরিগেশনের মতো সাশ্রয়ী সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার। ‘স্মার্ট এগ্রিকালচার’ বা ‘প্রিসিশন ফার্মিং’ (Precision Farming)-এর প্রচলন করতে হবে, যেখানে ড্রোন, সেন্সর এবং বিগ ডেটা অ্যানালাইসিস ব্যবহার করে ফসলের নির্দিষ্ট চাহিদা অনুযায়ী সার, পানি ও কীটনাশক প্রয়োগ করা যায়। শহরাঞ্চলে জায়গার স্বল্পতা বিবেচনায় ‘ভার্টিকাল ফার্মিং’ বা ‘অ্যাকুয়াপনিক্স’র মতো উদ্ভাবনী পদ্ধতিকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। চতুর্থত, নীতিগত ও আইনি সংস্কার। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধে আইনকে আরো কঠোর করতে হবে এবং তার দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষুদ্র কৃষকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সমবায়ভিত্তিক চাষাবাদ এবং সরাসরি ভোক্তার কাছে পণ্য পৌঁছানোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। এবং পঞ্চমত, ব্যক্তিপর্যায়ের সচেতনতা। প্রতিটি পরিবারকে খাদ্য অপচয় রোধে সচেতন হতে হবে। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কেনা বা রান্না করা বন্ধ করতে হবে।
মনে রাখতে হবে, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন যেমনটি দেখিয়েছেন, দুর্ভিক্ষ প্রায়শই খাদ্যের অভাবের কারণে হয় না, বরং তা হয় খাদ্যের সুষম বণ্টনের অভাবে বা মানুষের ক্রয়ক্ষমতা না থাকার কারণে। তাই বিশ্ব খাদ্য দিবসের আসল সার্থকতা নিহিত আছে বৈশ্বিক এই বৈষম্য অবসানের অঙ্গীকারে। গাজার ক্ষুধার্ত শিশুর কান্না আর উন্নত বিশ্বের ডাস্টবিনে পড়ে থাকা খাবারের বৈপরীত্য যখন আমাদের বিবেককে আর নাড়া দেবে না, তখন মানবজাতি হিসেবেই আমরা পরাজিত হবো। সুতরাং, আজকের এই দিনে আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকার হোক উৎপাদন বৃদ্ধি, অপচয় রোধ, সুষম বণ্টন এবং ভেজালমুক্ত নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার মাধ্যমে এমন এক বিশ্ব গড়ে তোলা, যেখানে কোনো মানুষকেই আর ক্ষুধার্ত অবস্থায় ঘুমাতে যেতে হবে না।

আব্দুল্লাহ্ সাহেদ : ব্যাংকার, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন