বিশ্ব মানবাধিকার সংকট ও আমাদের দায়বদ্ধতা
আব্দুল্লাহ্ সাহেদ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসলীলা, হলোকাস্টের নারকীয় হত্যাযজ্ঞ এবং কোটি মানুষের আর্তনাদ যখন বিশ্ববিবেকের দুয়ারে কড়া নাড়ছিল, ঠিক তখনই মানবজাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর প্যারিসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত হয় ‘সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা’ বা ইউডিএইচআর। এই ঐতিহাসিক দলিলে প্রথমবারের মতো স্বীকৃত হয় যে, বিশ্বের প্রতিটি মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও অধিকারে সমান। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষের বেঁচে থাকার, মতপ্রকাশের এবং ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার অবিচ্ছেদ্য।
আজ সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার ৭৬ বছর পেরিয়ে গেলেও বিশ্বজুড়ে মানবাধিকারের প্রকৃত চিত্রটি বড়ই বৈপরীত্যে ভরা। এই দিবসটি কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়, বরং এটি মানবসত্তার মর্যাদার পক্ষে দাঁড়ানোর একটি বার্ষিক শপথ।
মানবাধিকারের ধারণাটি মূলত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি ও মর্যাদাবোধ থেকে উৎসারিত, যা কোনো রাষ্ট্র বা সরকার দান করে না, বরং রাষ্ট্র তা রক্ষা করতে বাধ্য থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা থেকে শুরু করে ফরাসি বিপ্লব এবং পরবর্তীতে জাতিসংঘের এই ঘোষণা— সবই ছিল শোষণের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির সনদ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে যখন আমরা প্রযুক্তির চরম শিখরে অবস্থান করছি, তখন প্রশ্ন জাগে— আমরা কি আসলেই সভ্য হতে পেরেছি? পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। জাতিসংঘের মতে, বর্তমান বিশ্বে প্রায় ১১ কোটি মানুষ জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত, যা ইতিহাসের সর্বোচ্চ। দারিদ্র্য, যুদ্ধ এবং অসমতা মানবাধিকারের ধ্রুপদী সংজ্ঞাকে প্রতিনিয়ত উপহাস করছে। তাই ১০ ডিসেম্বরের গুরুত্ব কেবল অতীত রোমন্থনে নয়, বরং বর্তমানের আয়নায় নিজেদের কদর্য রূপটি দেখে ভবিষ্যতের জন্য শুধরে নেয়ার মধ্যে নিহিত। একটি সভ্য সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে মানবাধিকারের চর্চা অক্সিজেনের মতো অপরিহার্য, যা ছাড়া গণতন্ত্র বাঁচে না, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না এবং মানুষের আত্মমর্যাদা ভূলুণ্ঠিত হয়।
বর্তমান বিশ্বের মানবাধিকার পরিস্থিতির দিকে তাকালে যে চিত্রটি সবচেয়ে প্রকট হয়ে ওঠে, তা হলো পরাশক্তিগুলোর দ্বিমুখী নীতি এবং গাজার মতো স্থানগুলোতে চলমান নারকীয় তাণ্ডব। গত এক বছরে ফিলিস্তিনের গাজায় যা ঘটেছে, তা আধুনিক মানবাধিকারের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অথেন্টিক তথ্যানুযায়ী, ইসরায়েলি আগ্রাসনে ২০২৩-২৪ সময়ে গাজায় নিহতের সংখ্যা ৪৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশই নারী ও শিশু। এটি কেবল পরিসংখ্যান নয়; এটি বিশ্ববিবেকের কফিনে শেষ পেরেক। স্কুল, হাসপাতাল, এবং শরণার্থী শিবিরগুলোও আজ নিরাপদ নয়। মানবাধিকারের তথাকথিত ধারক ও বাহক হিসেবে পরিচিত পশ্চিমা বিশ্ব এবং তাদের মিত্ররা এখানে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছে, অথবা পরোক্ষভাবে আগ্রাসনে সহায়তা করছে। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় যেই দেশগুলো মানবাধিকার লঙ্ঘন নিয়ে সরব ছিল, গাজার ক্ষেত্রে তাদের ভেটো ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং অস্ত্র সরবরাহ প্রমাণ করে যে, মানবাধিকার আজ ভূ-রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলোর এই নগ্ন দ্বিমুখী আচরণের কারণে জাতিসংঘ বা আন্তর্জাতিক আদালতগুলো কার্যত দন্তহীন বাঘে পরিণত হয়েছে। তাদের করণীয় হওয়া উচিত ছিল অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, অস্ত্র ব্যবসার মুনাফা এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার মানবাধিকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। শুধু গাজা নয়, সুদান, ইয়েমেন, এবং মিয়ানমারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর চলমান নির্যাতন প্রমাণ করে যে, দুর্বল ও নিপীড়িতদের জন্য মানবাধিকারের বুলি কেবলই এক প্রহসন। এ অবস্থায় শক্তিশালী দেশগুলোর উচিত, অস্ত্র বাণিজ্য সংবরণ করা, জাতিসংঘের সংস্কার করে ভেটো ক্ষমতার একচ্ছত্র দাপট কমানো এবং সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা। নতুবা মানবাধিকার দিবস পালন কেবলই এক বিলাসিতায় পর্যবসিত হবে।
মানবাধিকারের এই বৈশ্বিক সংকটের পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যার জন্মই হয়েছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে। আমাদের সংবিধানের ১১, ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদে গণতন্ত্র, মৌলিক অধিকার, আইনের দৃষ্টিতে সমতা এবং জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও আমাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাতে পারেনি। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, বিশেষ করে ডিজিটাল বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ করার প্রবণতা একটি ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করেছে। শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রেও আমাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে; রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর পোশাক খাতে কিছু উন্নতি হলেও শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। অন্যদিকে, ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকেও মানবাধিকার একটি পবিত্র আমানত। ইসলাম ধর্মে মানবাধিকারের ধারণা অত্যন্ত সুস্পষ্ট এবং সর্বজনীন। বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, “আজকের এই দিন, এই মাস এবং এই শহর যেমন পবিত্র, তেমনি তোমাদের একে অপরের জান, মাল ও সম্মান পবিত্র।” কোনো আরবের ওপর অনারবের, কিংবা সাদার ওপর কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই— এই সাম্যবাদ ১৪০০ বছর আগেই ইসলাম প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইসলামে শ্রমিকের ঘাম শুকানোর আগেই পারিশ্রমিক দেওয়ার নির্দেশ এবং নারীর অধিকারের সুরক্ষা মানবাধিকারের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। অন্য ধর্মগুলোতেও জীবকে সেবা করা এবং অহিংসার বাণী প্রচার করা হয়েছে। সুতরাং, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা— উভয় দিক থেকেই বাংলাদেশে মানবাধিকার রক্ষা করা আমাদের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও মানবাধিকারের অন্যতম প্রধান শর্ত, যা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ আলোচিত ও সমালোচিত হয়েছে।
পরিশেষে, একটি শোষণমুক্ত ও মানবিক বিশ্ব গড়তে হলে আমাদের এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বাংলাদেশে মানবাধিকার চর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে সর্বাগ্রে বিচার বিভাগের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন নিশ্চিত করতে হবে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে কেবল একটি সুপারিশকারী প্রতিষ্ঠান না রেখে, তাকে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের পূর্ণ ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং ‘ দায়মুক্তি বা ইমপিউনিটি’র সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। পুলিশি হেফাজতে নির্যাতন বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং কারাগারগুলোর সংস্কার প্রয়োজন। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা সমাজের দর্পণ হিসেবে নির্ভয়ে কাজ করতে পারে। পাশাপাশি, শিক্ষাব্যবস্থায় মানবাধিকার বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম ছোটবেলা থেকেই অন্যের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে বেড়ে ওঠে। বিশ্বমঞ্চে শক্তিশালী দেশগুলোর কপটতা মোকাবিলার জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জোটবদ্ধ হয়ে আওয়াজ তুলতে হবে। গাজা বা বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হলে কেবল নিন্দা জানিয়ে দায় সারালে চলবে না, বরং অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে। নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটির ভূমিকা এখানে অনস্বীকার্য; তাদের সজাগ দৃষ্টি এবং প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রকে সঠিক পথে রাখতে সাহায্য করে।
১০ ডিসেম্বরের এই দিনে আমাদের অঙ্গীকার হোক এমন একটি পৃথিবী গড়ার, যেখানে কোনো শিশু অনাহারে থাকবে না, কোনো মানুষ মতপ্রকাশের জন্য কারারুদ্ধ হবে না এবং যুদ্ধের বারুদে কোনো জনপদ পুড়ে ছাই হবে না। মানবাধিকারের লড়াই কোনো একক দিন বা গোষ্ঠীর নয়, এটি মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে বৈষম্যহীন, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক মর্যাদাপূর্ণ সমাজ গঠনে ব্রতী হই, তবেই বিশ্ব মানবাধিকার দিবসের প্রকৃত তাৎপর্য সার্থক হবে।
আব্দুল্লাহ্ সাহেদ : ব্যাংকার, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক