বেগম রোকেয়া দিবসে শ্রদ্ধা
অগ্রগতির পথেই হাঁটছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের নারীরাও

তৌফিকুল ইসলাম তৌফিক
বাংলাদেশে ডিসেম্বর কেবল বিজয়ের মাসই নয়, এটি নারীর অদম্যতার প্রতীকও। এই মাসের ৯ তারিখ দেশব্যাপী পালিত হয় বেগম রোকেয়া দিবস। এই দিনে মহীয়সী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের স্বপ্ন, সংগ্রাম, চিন্তা ও প্রগতিশীল মননকে স্মরণ করা হয়। তাঁর দেখানো পথ ধরে, নারীর শিক্ষা, অধিকার আর অন্তর্নিহিত শক্তির জাগরণ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের প্রতিটি জেলা উপজেলায়।
বেগম রোকেয়া শুধু একজন নারী-শিক্ষা আন্দোলনের পথিকৃৎ নন— তিনি ছিলেন এক যুগান্তকারী আলো, যাঁর দীপ্তিতে শত বছর পরও অগণিত নারী নিজেদের পথ খুঁজে নিচ্ছে। আমাদের সমাজের অন্ধকার ভেদ করে যে নারী আজ স্বাধীনভাবে স্বপ্ন দেখে, নিজের যোগ্যতায় পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে এগিয়ে নিতে পারে— তার পেছনে রোকেয়ার অলৌকিক আলোর ছোঁয়া আছে।
এই আলোর স্পর্শ চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাকেও আলোকিত করছে। সীমান্ত-সংলগ্ন এই জনপদে নারীরা একসময় শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতায় আবদ্ধ ছিল। সামাজিক কুসংস্কার, অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা, নিরাপত্তা শঙ্কা কিংবা প্রথাগত ভাবনা তাদের পথ আটকে রাখত।
কিন্তু সময় বদলেছে। একসময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ মানে ছিল সীমান্ত, আমবাগান, মহানন্দার জীবনধারা আর কৃষিশ্রমে ব্যস্ত মানুষের গল্প। কিন্তু সময় বদলেছে। মানুষের চাহিদা বদলেছে। আর সবচেয়ে বড় বদলটা এসেছে সমাজের অর্ধেক অংশ— নারীদের মধ্যে। তারা আর ঘরের ভেতর বন্দি গল্প নয়; তারা এখন নিজের গল্প নিজেরাই লিখছে। নিজের হাতে তৈরি করছে নাম, পরিচয়, আয় আর সম্মান। সামাজিক বাধা, পরিবারের সন্দেহ, অর্থাভাব— সবকিছুকে পেছনে ফেলে এই নারীরা আজ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকে স্থানীয় ব্র্যান্ড মালিক, আবার কেউ কেউ হয়ে উঠছেন স্টার্টআপ ফাউন্ডার।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার মেয়েরা কখনো ভাবেনি বাসায় বসে কেউ বিদেশে হ্যান্ডমেইড পণ্য পাঠাবে, কেউ অনলাইনে ব্র্যান্ড চালু করবে, কেউ কসমেটিকস বা ফ্যাশন ব্র্যান্ড তৈরি করবে।
আজ সেসবই হচ্ছে। কারণ— স্মার্টফোন, ইন্টারনেট, ফেসবুক মার্কেটপ্লেস, অনলাইন পেমেন্ট, ঘরে বসে শেখার অসংখ্য সুযোগ। এসব মিলেই গড়ে উঠেছে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তা সংস্কৃতি। যারা আগে চাকরি খুঁজে বেড়াতেন, এখন তারা নিজেরাই কর্মসংস্থান তৈরি করছেন। আর এই পরিবর্তনের অগ্রভাগে আছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেয়েরাও।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখন যে নারী উদ্যোক্তাদের উত্থান দেখা যাচ্ছে— এটি শুধু কয়েকজনের নয়, এটি একটি সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাস। এখানকার গ্রামের ঘরে ঘরেই ছিল হস্তশিল্পের দক্ষতা— নকশিকাঁথা, সেলাই, বোনা, সুতার কাজ, পুঁতির কাজ, বাঁশবেতের কাজ। কিন্তু এগুলোর কোনো বাজার ছিল না। একদল নারী খুব শ্রম দিয়ে কাজগুলো করলেও তাদের পরিচিতি, মূল্য, সম্মান— কিছুই ছিল না। কিন্তু ফেসবুক লাইভ, ইনস্টাগ্রাম, অনলাইন শপ— এসব বদলে দিয়েছে পুরো সমীকরণ।
এখন চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গ্রামের মেয়েদের তৈরি একটি নকশিকাঁথা ঢাকার ক্রেতা কিনছে, আবার সিলেট বা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কেউ না কেউ অর্ডার করছে অনলাইনে। কেউ কেউ তাদের পণ্য পাঠাচ্ছে বিদেশেও।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখন মেয়েরা অনলাইনে— পোশাক, আমভিত্তিক খাবার, কসমেটিকস, হিজাব-গাউন, হাতে বানানো জুয়েলারি, ঘর সাজানোর সামগ্রী, হোমমেড কেক/পিঠা সবই বিক্রি করছে। অনেকেই দিনে ২০ থেকে ৮০টি অর্ডারও পাচ্ছেন।
একটি ফোন, একটি ভালো ক্যামেরা, কিছু পরিশ্রম— এই তিন জিনিস দিয়েই ব্যবসা দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে নতুন প্রজন্ম। সবচেয়ে বড় কথা— তারা নিজেরা আয় করছে, নিজেরা আত্মবিশ্বাসী হচ্ছে।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর আয়োজন করেছে ‘অদম্য নারী পুরস্কার ২০২৫’— যা আন্তর্জাতিক নারী নির্যাতন প্রতিরোধ পক্ষ (২৫ নভেম্বর-১০ ডিসেম্বর) উপলক্ষে দেশের প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় প্রদান করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য— এই দেশের নারীরা যে অদম্য, সে কথাটি নতুন প্রজন্মকে জানানো।
কিন্তু প্রতিটি স্বীকৃতির ভেতর যে গল্প থাকে, সেসব গল্পই তো সমাজকে বদলে দেয়। ঠিক সেই পথ ধরে আজকের এই গল্প— চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নারীদের নিয়ে, যারা নিজেদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন যে অদম্যতা শুধু পুরস্কারের বিষয় নয়, এটি বেঁচে থাকার এক সুনিশ্চিত শক্তি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের যে নারীরা আগে ঘর-সংসারের ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল, তারা এখন— সমাজ বদলাচ্ছে, অর্থনীতিকে শক্ত করছে, অন্য মেয়েদের অনুপ্রাণিত করছে, নিজের স্বপ্ন বাস্তবে রূপ দিচ্ছে, ব্র্যান্ড তৈরি করছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। তারা শুধু উদ্যোক্তা নন— তারা হলেন সাহসের প্রতীক, পরিবর্তনের আলো। অদম্য নারী বলতে যা বোঝায়, সে তারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর সাধারণত শিক্ষা ও চাকুরী ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনকারী নারী, অর্থনৈতিকভাবে সাফল্য অর্জনকারী নারী, সমাজ উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখেছেন যে নারী, সফল জননী ও নির্যাতনের বিভীষিকা মুছে ফেলে নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করেছেন যে নারী— এই পাঁচটি ক্যাটাগরিতে ‘অদম্য নারী পুরস্কার’ দিয়ে থাকে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের নারীরা এই পাঁচ ক্যাটাগরিতেই নানা সময়ে সাফল্যের ছাপ রেখে চলেছেন। অনেকেই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে হস্তশিল্প, অনলাইন ব্যবসা, সফল জননী এবং সামাজিক কাজে অদম্য নারী হিসেবে পুরস্কৃত হয়েছেন। প্রত্যাশা থাকবে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের নারীরা কেন্দ্রীয়ভাবেও পুরস্কার নিয়ে আসবেন।
বেগম রোকেয়া যখন শত বছর আগে বলেছিলেন— “নারীর অগ্রগতির শত্রু তিনটি— অজ্ঞতা, জড়তা, কুসংস্কার।” তখন তিনি হয়তো জানতেন না যে, তাঁর কথাগুলো একদিন বরেন্দ্র ভূমির হাজারো নারীর বুকে আগুনের মতো দীপ্তি ছড়াবে।
আজ চাঁপাইনবাবগঞ্জের মেয়েরা আর জড়তায় নয়, অগ্রগতির পথেই হাঁটে। তারা জানে— স্বপ্ন দেখলে আকাশও ধরা যায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের অদম্য নারীরা দেশেরও সম্পদ।
রোকেয়া দিবসের মূল সাফল্য— নারীকে তার স্বপ্নের পথ দেখিয়ে দেওয়া। তাই বেগম রোকেয়া দিবস কেবল স্মরণ নয়— এটি এক প্রতিজ্ঞা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নারী শক্তি আজ দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক পরিবর্তনের বাহক।
তারা কাজ করেন— নিঃশব্দে, ধৈর্যের সঙ্গে, গর্বের সঙ্গে। তাদের শ্রমে বদলায় পরিবার, সমাজ, দেশ।
বেগম রোকেয়ার ভাষায়— “নারী যখন জাগে, জাতি তখন জাগে।” চাঁপাইনবাবগঞ্জের নারীরা আজ ঠিক সেই জাগরণেরই প্রতিচ্ছবি।
তৌফিকুল ইসলাম : লেখক ও সম্পাদক, স্বর্ণালী সাহিত্য পরিষদ