মাইক্রোফোনের ওপারে আমার পথচলা
মো. নয়ন আলী

‘হ্যালো শ্রোতাবন্ধু!’— শব্দটা শুনলেই আমার এখনো বুক কেমন কেমন করে। যে শব্দটি বলার জন্য একটা সময়, কতই না অপেক্ষার প্রহর গুণতাম এবং প্রস্তুতি নিতাম। তবে আজ ভাবতেই অবাক লাগে— এই মাইক্রোফোনের সামনে কত বছর কাটিয়ে দিলাম! রেডিও মহানন্দা আমার পথচলার এতটাই অংশ হয়ে গেছে যে, মনে হয়— এটা না থাকলে আমি হয়তো আমি-ই হতাম না।
আজ আমি রেডিও মহানন্দায় অনুষ্ঠান ও খবরের প্রযোজক হিসেবে কাজ করছি। কিন্তু কাজের পরিচয়ের চেয়েও বড় বিষয় হলো— এই রেডিওর সঙ্গে আমার সম্পর্ক। ২০১২ সালের শেষের দিকে একজন ভলেন্টিয়ার হিসেবে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তা একটি পূর্ণাঙ্গ পেশা ও মানসিক বন্ধনে পরিণত হয়েছে।
এই রেডিও স্টেশন শুধু একটি কর্মক্ষেত্র নয়; এটি আমার শেখার জায়গা, মানুষের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করার মাধ্যম, আর নিজের এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার বাস্তব সুযোগ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দায়িত্ব বদলেছে, অভিজ্ঞতা বেড়েছে, দৃষ্টিভঙ্গি বদলেছে— কিন্তু কমিউনিটির প্রতি ভালোবাসা একই রকম রয়েছে।
রেডিও মহানন্দার কৃষি বিষয়ক অনুষ্ঠান ‘কৃষি ও জীবন’ প্রযোজনা করা আমার কাছে সবচেয়ে দায়িত্বপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি। এই এলাকার কৃষকরা আমাদের সমাজের মেরুদণ্ড। তাদের জীবনযাপন, শ্রম, অভিজ্ঞতা ও সমস্যার সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়েছি শুধুমাত্র এই অনুষ্ঠানের কারণে। অনেক সময় মাঠে গিয়ে কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছি— কখনো জমিতে দাঁড়িয়ে, কখনো খড়ের গাদায় পাশে বসে, কখনো আবার ছায়াঘেরা গাছতলায়, কখনো কোনো আমবাগানে। কথোপকথনের প্রতিটি মুহূর্ত আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে, কৃষির প্রকৃত শক্তি কোনো বই বা প্রতিবেদনে নেই; আছে মাঠের মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতায়।
আমাদের অনুষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য থাকে খুবই স্পষ্ট— কৃষকের বাস্তব সমস্যার সমাধান, তাদের কাছে উপযোগী তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং নতুন প্রযুক্তি বা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা। বীজ ব্যবস্থাপনা, কীটনাশকের ব্যবহার, আধুনিক সেচ প্রযুক্তি, মাটির স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব— এসব বিষয়ে আমরা যতটা সহজভাবে বলা সম্ভব, চেষ্টা করি সেইভাবে তথ্য তুলে ধরতে।
ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, বিশেষ করে সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর সঙ্গেও কাজ করার অভিজ্ঞতা আমার পেশাগত জীবনকে আরো বিস্তৃত করেছে। তাদের কৃষি পদ্ধতি, সংস্কৃতি, স্থানীয় জ্ঞান— এসব জানার সুযোগ হয়েছে অনুষ্ঠান তৈরির সময়। তাদের মুখ থেকে কথা বের করা বেশ কষ্টের। তবে তারা যখন মাইক্রোফোনের সামনে খোলামেলা কথা বলেন, তখন বুঝতে পারি— রেডিও তাদের কাছে কতটা আপন।
রেডিও মহানন্দার হয়ে কাজ করতে গিয়ে দেশের কয়েকটি জেলায় গিয়েছি, পেশাগত দায়িত্ব পালন ও প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশ নিতে। প্রতিটি সফর আমার কাছে ছিল আলাদা শেখার জায়গা। আমি দেখেছি, কৃষি শুধু ক্ষেতের ফসল নয়; এটি আমাদের সংস্কৃতি, অর্থনীতি এবং সমাজ কাঠামোর মূল ভিত্তিগুলোর একটি। কৃষিকাজের সঙ্গে মানুষের পরিচয়, তাদের জীবনধারা, এমনকি তাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাও জড়িয়ে থাকে। মাঠে দাঁড়িয়ে এসব বিষয় উপলব্ধি করা একজন প্রযোজকের দৃষ্টিভঙ্গিকে বদলে দেয়।
২০২৪ সালে নেপালে টিওটি প্রশিক্ষণে অংশ নেয়া আমার পেশাদার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা। ভারত, তিমুর লেস্তে, বাংলাদেশ, নেপাল ও ইন্দোনেশিয়ার কমিউনিটি রেডিওকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করে বুঝেছি, কমিউনিটি রেডিওর শক্তি বিশ্বজুড়ে একই— এটি মানুষের কথা তুলে ধরে, তথ্য পৌঁছে দেয়, আর পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি করে। এই অভিজ্ঞতা আমার অনুষ্ঠান নির্মাণকে আরো গভীর করেছে, বিশেষ করে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রে।
রেডিও মহানন্দার জন্য অনুষ্ঠান নির্মাণ করে কমিউনিটি রেডিও তথ্য অধিকার অ্যাওয়ার্ড পাওয়া আমার কর্মজীবনের অন্যতম বড় সাফল্য। এই পুরস্কার আমাকে মনে করিয়ে দিয়েছে যে, কমিউনিটির জন্য কাজ করতে হলে দায়িত্ববোধ আরো বাড়িয়ে নিতে হয়।
রেডিও মহানন্দার ১৪ বছরের যাত্রার অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী কেবল উৎসব নয়; এটি আমাদের কাজের মূল্যায়ন করার সময়, সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা পাওয়ার সময়। আমরা যে কৃষিনির্ভর অঞ্চলে কাজ করি, সেখানে এই অনুষ্ঠানগুলো মানুষের জীবনে সত্যি সত্যিই পরিবর্তন আনে— এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সফলতা।
আমি বিশ্বাস করি, এখনো অনেক কিছু শেখার আছে। কৃষকের প্রতিটি মৌসুম নতুন অভিজ্ঞতা দেয়, প্রতিটি সমস্যার ভেতর থাকে নতুন শিক্ষা, আর প্রতিটি মানুষের গল্প আমাদের অনুষ্ঠানকে নতুন দিক নির্দেশনা দেয়। রেডিও মহানন্দা আমাকে শিখিয়েছে— যদি মানুষের পাশে দাঁড়ানো যায়, তাদের কথা মন দিয়ে শোনা যায়, এবং তথ্য তাদের কাছে সহজ ভাষায় পৌঁছে দেওয়া যায়— তাহলে পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী।
আগামী দিনে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠানগুলো আরো বৈচিত্র্যময়, আরো তথ্যসমৃদ্ধ এবং আরো কৃষকবান্ধব করতে চাই। কমিউনিটির প্রতিটি মানুষ যেন অনুভব করেন— রেডিও মহানন্দা তাদেরই রেডিও, তাদেরই প্ল্যাটফর্ম।
আজ রেডিও মহানন্দার ১৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
চৌদ্দ বছরের যাত্রায়— আমি ছিলাম ছোট্ট একটা অংশ…
তবুও বড় ভালোবাসা নিয়ে।
আমি শুধু নয়ন আলী, একজন প্রযোজক,
কিন্তু তার চেয়েও বেশি
মানুষের গল্প বহনকারী।
আমি চাই, মাটি, কৃষক ও কমিউনিটির মানুষের প্রতি আমার এই দায়বদ্ধতা ভবিষ্যতেও অটুট থাকুক। সামনে আরো অনেক পথ, আরো অনেক কাজ, আরো অনেক গল্প বলার অপেক্ষা করছে। আমি বিশ্বাস করি— রেডিও মহানন্দার আলোকিত এই পথচলায় আমার শব্দ, আমার পরিশ্রম আর আমার দায়িত্ববোধ যুক্ত থাকবে একইভাবে।
মো. নয়ন আলী : প্রযোজক (অনুষ্ঠান ও খবর), রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম