রেইজের এক সুযোগই জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল হামিমের

রাজশাহীর তানোর উপজেলার একটি গ্রাম একান্নপুর। এই গ্রামেরই আম ব্যবসায়ী মনিরুল ইসলামের ছেলে হামিম আলী। যার জীবনের গল্প সিনেমার চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। হামিম আলী প্রমাণ করেছেন, বয়স নয় জীবনকে এগিয়ে নিতে মনের জোরই হচ্ছে মূল চালিকাশক্তি।
হামিম আলীর পড়াশোনার দৌড় ক্লাস এইট পর্যন্ত। এরপর নিজের বাড়ির পাশে মুদি দোকান শুরু করেন। শুরুতে সবকিছু ভালোই চলছিল। একসময় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন হামিম।
তবে শুরুর ভালো অনেক সময় টেকসই হয় না। হামিমের জীবনেও তাই ঘটে। কিছুদিন যাওয়ার পর বিভিন্ন লোকজনের কাছে বকেয়া, কোম্পানির কাছে ঋণের চাপ বাড়তে থাকায় ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে বাবার ব্যবসাতেও মন্দা দেখা দেয়। একসময় বাবা ও ছেলের ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৭ লাখ টাকা।
চরম দুঃসময় নেমে আসে বাবা-ছেলের জীবনে। কোনো পথই খুঁজে পাচ্ছিলেন না তারা। কী করবেন— এই চিন্তায় দিশেহারা হয়ে পড়েন।
দুঃসময়ের অন্ধকার চিরে এক টুকরো আলোর দিশা হিসেবে পথ খুঁজে পান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা’র মাধ্যমে। রেডিও শোনার অভ্যাস থেকে রেডিও মহানন্দার মাধ্যমে জানতে পারেন পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)র আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন ট্রেডে হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি।
পরের গল্প তার জীবন বদলে দেবার, একজন সফল উদ্যোক্তা হওয়ার।
দৃঢ় মনোবল এবং সুযোগ— এই দুইকে পুঁজি করে নতুনভাবে জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন হামিম আলী। এবার হামিমের মুখেই শোনা যাক, তার জীবনের গল্প।
তিনি বলেন, রেডিও মহানন্দার মাধ্যমে প্রশিক্ষণের কথা জানতে পেরে প্রয়াসের রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপকের সাথে যোগাযোগ করে মোবাইল সার্ভিসিং ট্রেডে প্রশিক্ষণের জন্য আবেদন করি। পরবর্তীতে মৌখিক পরীক্ষা দিই এবং রেইজ প্রকল্পের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সেন্টু মার্কেটে অবস্থিত মোবাইল ক্লিনিকে ওস্তাদ অনুজের কাছে শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ শেখার সুযোগ পাই।
তিনি আরো বলেন, ঋণের বোঝা ছিল মাথায়। তাই মোবাইল সার্ভিসিং প্রশিক্ষণকে গুরুত্বের সাথে নিই এবং ভেবেই নিয়েছিলাম, এটাই আমার জন্য শেষ সুযোগ। তাই গভীর মনোযোগ দিয়ে কাজ শেখার চেষ্টা করেছি। প্রশিক্ষণের জন্য সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা নির্ধারিত সময় থাকলেও আমি রাত ৮টা পর্যন্ত থেকে কাজ শিখতাম।
হামিম বলেন, এভাবে ছয় মাস কাজ শেখার পরে একটি দোকানের পাশে ছোট্ট টেবিলে কমিশনভিত্তিক মোবাইল সার্ভিসিং শুরু করি। এক বছর কমিশনে কাজ করার পর সেই টেবিলটি ভাড়া নিই মাসিক ১৪ হাজার টাকায়। প্রতি মাসে টেবিল ভাড়া দেয়ার পরও আমার হাতে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা থাকত। পরবর্তীতে বাবার ব্যবসা ও আমার মোবাইল সার্ভিসিংয়ের আয় দিয়ে প্রায় ৭ লাখ টাকা দেনা পরিশোধ করি।
তিনি আরো জানান, এখন একটা মোটরসাইকেল কিনেছি। আলাদা করে নতুন দোকানও ভাড়া নিয়েছি। প্রতি মাসে ভাড়া দেই ৯ হাজার টাকা। দুজন কর্মচারীও আছে, তাদেরকে প্রতি মাসে ১২ হাজার টাকা বেতন দেই। এই দুজনকে আমি কাজ শিখাই।
হামিম আরো বলেন, ছয় মাস তানোর থেকে চাঁপাইনবাবগঞ্জে আসতেন প্রশিক্ষণ নিতে। আর এই প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির রেইজ প্রকল্প থেকে ২১ হাজার টাকাও পেয়েছি। প্রশিক্ষণের সুযোগ যেমন পেয়েছি— এটা যেমন সত্য; তেমনি এই ২১ হাজার টাকা না পেলে হয়তো প্রশিক্ষণটাও নিতে আসতে পারতাম না। তাই বলব, প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি ও রেইজ প্রকল্প আমাকে শুধু কাজ শেখায়নি, দিয়েছে আত্মবিশ্বাসও। এজন্যই আজ আমি স্বাবলম্বী। শুধু নিজের জীবনই পরিবর্তন করিনি বরং অন্যদেরও পথ দেখাতে সহাযোগিতা করতে পারছি। তাই রেইজ প্রকল্পের প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তারা আমাকে নতুন করে স্বপ্ন না দেখালে হয়তো অন্ধকারে পড়ে থাকতাম।
প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির রেইজ প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আলম বিশ্বাস বলেন, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)’র আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় বেকার যুবকদের বিভিন্ন ট্রেডভিত্তিক হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এখানে যারা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে তাদেরকে যাতায়াত ভাতা বাবদ ছয় মাসে ২১ হাজার টাকা এবং যারা কাজ শেখাই তাদেরকে ১৮ হাজার টাকা করে দেয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের সার্টিফিকেটও প্রদান করা হয়।
আলম বিশ্বাস আরো বলেন, হামিম আলীর মতো অন্যরাও যখন আমাদের প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বাবলম্বী হন, ঘুরে দাঁড়াই তখন রেইজ প্রকল্প সার্থক বলে মনে হয়।