শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত

লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন তিন সাংবাদিক। একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় ওই তিন সাংবাদিক নিহত হন। তাদের মধ্যে একজন হিজবুল্লাহ-ঘনিষ্ঠ টেলিভিশনের প্রতিবেদক। এছাড়া একই হামলায় ভাইয়ের সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছেন এক নারী সাংবাদিক। এ ঘটনায় যুদ্ধের মধ্যেও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদমাধ্যম সিএনএন বলছে, লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় তিন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে হিজবুল্লাহ-নিয়ন্ত্রিত টেলিভিশন আল মানারের প্রতিবেদক আলি শুয়াইব রয়েছেন। আল মানার জানিয়েছে, আলি শুয়াইব যে গাড়িতে ছিলেন, সেটিকে লক্ষ্য করে চালানো ইসরায়েলি হামলায় তিনি নিহত হন। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, শুয়াইব ‘সাংবাদিকতার ছদ্মবেশে সন্ত্রাসী হিসেবে কাজ করছিলেন’ এবং দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সেনাদের অবস্থান প্রকাশ করছিলেন। অন্যদিকে আল মানার তাদের প্রতিবেদনে শুয়াইবকে ‘প্রতিরোধের প্রতীক সাংবাদিক’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।সাংবাদিক সুরক্ষা সংস্থা কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে) এই হামলার তদন্ত শুরু করেছে। সংস্থাটি বলেছে, ‘সাংবাদিকরা যেই প্রতিষ্ঠানেরই হোক না কেন, তারা হামলার বৈধ লক্ষ্যবস্তু নয়।’ সিপিজে আরও জানিয়েছে, ‘এই যুদ্ধে এবং এর আগের কয়েক দশক ধরেই আমরা একটি উদ্বেগজনক ধারা দেখছি। আর তা হলো- ইসরায়েল সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়াই যোদ্ধা বা সন্ত্রাসী হওয়ার অভিযোগ তোলে।’

ইরানপন্থি ও হিজবুল্লাহ-সমর্থিত আল মায়াদিন চ্যানেল জানিয়েছে, একই হামলায় আপন ভাইবোন ফাতিমা তৌনি ও মোহাম্মদ তৌনিও নিহত হয়েছেন। লেবাননের প্রেসিডেন্টের দপ্তর এই হামলাকে ‘স্পষ্ট অপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেয়া পোস্টে তারা বলেছে, ‘ইসরায়েলি আগ্রাসন আবারও আন্তর্জাতিক আইন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধের নীতিমালা লঙ্ঘন করেছে, কারণ তারা সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। এসব সাংবাদিক মূলত বেসামরিক নাগরিক এবং তারা কেবল তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছিলেন।’ অবশ্য ইসরায়েলের বিবৃতিতে অন্য দুই সাংবাদিকের বিষয়ে কিছু বলা হয়নি। লেবাননের তথ্যমন্ত্রী পল মোরকোস এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সরকার এ ঘটনাকে ‘গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত ও প্রকাশ্য যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে বিবেচনা করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে অভিযোগ দেবে। তিনি বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো মেনে চলি। এসব চুক্তিতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।’ আল মায়াদিন প্রকাশিত এক ভিডিওতে ফাতিমা ও মোহাম্মদ তৌনির বাবা বলেন, তিনি তাদের নিয়ে গর্বিত। তিনি বলেন, ‘আমি একজন বাবা হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াই। চোখে পানি আসে, হৃদয়ে কষ্ট থাকে, কিন্তু আমরা ভেঙে পড়ি না।’ হামলার পর আল মায়াদিনের সাংবাদিক জামাল আল-ঘারাবি ঘটনাস্থলে গিয়ে একটি পুড়ে যাওয়া গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘এটি বেসামরিক গাড়ি,’ এবং দাবি করেন, এতে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। তিনি ‘প্রেস’ লেখা একটি বুলেটপ্রুফ ভেস্ট দেখিয়ে বলেন, ‘এই ভেস্ট আমার সহকর্মীদের রক্ষা করার কথা ছিল’। আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বারবার বলেন, ‘এই ভেস্ট তাদের রক্ষা করার কথা ছিল!’

আরেকটি ভেস্ট তুলে ধরে তিনি বলেন, এটি ফাতিমা তৌনির ছিল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘ইসরায়েলের আগ্রাসনের সামনে এই ভেস্ট কী করতে পারে? সাংবাদিক ও বেসামরিকদের সুরক্ষার আন্তর্জাতিক আইন কোথায়?’ এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে এক হামলায় ফাতিমা তৌনি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। সে সময় দক্ষিণ লেবাননে সাংবাদিকদের একটি কমপ্লেক্সে হামলায় দুই সাংবাদিক ও এক গণমাধ্যমকর্মী নিহত হন বলে সিপিজে জানিয়েছিল। সেসময় এক ভিডিওতে ফাতিমা ধ্বংস হওয়া গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে তার হেলমেট, ভেস্ট ও মাইক্রোফোন দেখিয়ে বলেছিলেন, ‘এটাই আমার সরঞ্জাম, এটাই আমাদের অস্ত্র।’

শেয়ার করুন