শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

শুধু ডিগ্রিধারী নয়, দক্ষ ও মানবিক মানুষ চাই

আব্দুল্লাহ্ সাহেদ

গত কয়েক সপ্তাহ আগে ৪৪তম বিসিএস এবং এসএসসি পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। দেশের প্রধান প্রধান পত্রিকা এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালগুলোতে সফলতা অর্জনকারীদের ছবি, নাম, প্রতিষ্ঠানের নাম এবং তাদের সাফল্যের কাহিনী ছাপানো হয়েছে পরপর কয়েকদিন ধরে। একই সময়ে এইচএসসি পরীক্ষা চলছে, এবং একদল শিক্ষার্থী জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ অতিক্রম করার লড়াইয়ে ব্যস্ত।
দেশের অগ্রগতি, শিক্ষা ও প্রতিযোগিতার চিত্র ফুটে ওঠে এসব খবরে। তবে প্রশ্ন হলো, যারা ব্যর্থ হলো, যারা শত চেষ্টা ও পরিশ্রম করেও উত্তীর্ণ হতে পারল না, তাদের খবর কোথায়? রাত জেগে পড়া, দিনরাতের প্র্যাকটিস, কোচিং সেন্টারের ফি জোগাড়ে পরিবারের দুশ্চিন্তা— এইসব গল্প কি কোনো দিন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়? হয় না। কারণ আমরা শুধু সফলতার গল্পে মুগ্ধ থাকি, ব্যর্থতার কারণ বিশ্লেষণ করতে চাই না।
বাংলাদেশে প্রতিবছর শতাধিক নিয়োগ পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি কর্ম কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, শুধু বিসিএস পরীক্ষাতেই প্রতিবছর প্রায় ৪-৫ লাখ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন, যেখানে গড়ে নিয়োগ পান ২ হাজার থেকে ৪ হাজার জন। অর্থাৎ, প্রতি বছর গড়ে ৯৯ শতাংশ পরীক্ষার্থী চাকরির বাইরে থাকেন। এছাড়া ব্যাংক, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষা বোর্ডসহ অন্যান্য নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও একইরকম চিত্র দেখা যায়। আবার, বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকস (বিবিএস)-এর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ লাখেরও বেশি। অথচ প্রতি বছর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ মিলিয়ে প্রায় ৮-৯ লাখ নতুন গ্র্যাজুয়েট তৈরি হয়।
এত সংখ্যক গ্র্যাজুয়েট তৈরি হওয়া সত্ত্বেও দেশে কেন এত বেকারত্ব? কেন একটি ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও একজন তরুণ চাকরি পাচ্ছেন না? কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, এই ডিগ্রির পেছনে লুকিয়ে রয়েছে কয়েকটি মৌলিক সমস্যা। প্রথমত, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো মুখস্থনির্ভর; দ্বিতীয়ত, পাঠ্যসূচি জীবনের সঙ্গে সংযুক্ত নয়; তৃতীয়ত, চাকরির বাজারে চাহিদা যেসব স্কিল বা দক্ষতার, তা আমাদের পাঠ্যবইয়ের মধ্যে নেই।
একজন ছাত্র যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বেরিয়ে আসে, তার হাতে একটা সার্টিফিকেট থাকলেও অনেক সময় কাজের অভিজ্ঞতা বা বাস্তবর্ধমী দক্ষতা থাকে না। কম্পিউটার স্কিল, ভাষা দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, ক্রিটিকাল থিংকিং, দলবদ্ধভাবে কাজ করার সামর্থ্য— এই সবগুলোই একটি কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। কিন্তু আমাদের ডিগ্রিপ্রাপ্ত অনেকেই এসবের কিছুই জানেন না। শুধু ডিগ্রি থাকলেই চাকরি মিলবে, এই মানসিকতা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে।
এদেশে মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ দিন দিন কমে যাচ্ছে। আমাদের সমাজে পুঁথিগত বিদ্যার চেয়ে আত্মিক শিক্ষা বা মূল্যবোধের শিক্ষা অনেক বেশি দরকার। কেউ প্রথম শ্রেণী পেয়েছে, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছে, তা তার মানবিকতা, সহানুভূতি বা নৈতিকতার নিশ্চয়তা দেয় না। বর্তমানে আমরা এমন অনেক শিক্ষিত মানুষ দেখি, যারা পদে আছে, ক্ষমতায় আছে, কিন্তু মানুষের প্রতি দায়িত্বশীলতা নেই, নৈতিকতা নেই, সততা নেই। শিক্ষা যদি একজন মানুষকে আরো ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে না তোলে, তবে সেই শিক্ষা সমাজের উপকারে আসে না, বরং ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এই সমস্যা সমাধানে আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, শিক্ষার কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। আমাদের শিক্ষানীতিতে এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষায় পাস করার জন্য না পড়ে, বরং জীবনের জন্য পড়ে। কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে আরো গুরুত্ব¡ দিতে হবে। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে, জার্মানি, জাপান, কোরিয়া, চীন, এমনকি মালয়েশিয়াও প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার ওপর জোর দিয়েছে। ওখানে একজন কারিগরি শিক্ষিত লোকের সামাজিক মর্যাদা, আয় এবং কর্মক্ষেত্রের সুযোগ অনেক বেশি। বাংলাদেশে এখনো পিতা-মাতারা সন্তানকে কারিগরি প্রতিষ্ঠানে না পাঠিয়ে ‘ভালো কলেজে পড়ার’ চাপ দেন, যা শিক্ষাকে শুধু সার্টিফিকেটনির্ভর করে তোলে।
দ্বিতীয়ত, দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি প্রত্যেক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে কম্পিউটার, ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, যোগাযোগ দক্ষতা, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ এসব শেখানোর ব্যবস্থা রাখতে হবে। উন্নত বিশ্বে একজন শিক্ষার্থী যখন গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন, তখন তার একটি নির্দিষ্ট স্কিল সেট থাকে। অথচ আমাদের দেশে একজন এম.এ. পাস শিক্ষার্থীকে অনেক সময় কম্পিউটারে বায়োডাটা টাইপ করতেও হিমশিম খেতে হয়।
তৃতীয়ত, মানবিক মানুষ তৈরি করার শিক্ষা দিতে হবে। স্কুলপর্যায় থেকেই ‘মূল্যবোধ শিক্ষা’, ‘নৈতিকতা’ ও ‘সামাজিক দায়িত্ববোধ’ বিষয়ে পাঠ্যক্রম চালু করতে হবে। শিশুকে শুধু গণিত ও বিজ্ঞানের জ্ঞান দিলেই চলবে না, তাকে ভালো মানুষ হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে, যাতে সে ভবিষ্যতে ক্ষমতার অপব্যবহার না করে, দুর্নীতি না করে, সমাজের পাশে দাঁড়ায়।
চতুর্থত, উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। সবাই চাকরি খুঁজবে, এটা চিন্তাভাবনার সীমাবদ্ধতা। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমন পরিবর্তন আনতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখে, ক্ষুদ্র বা মাঝারি উদ্যোগ নিতে শেখে, প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে শেখে। উদ্যোক্তা মানেই অনেক টাকা নয়, উদ্যোক্তা মানে সমস্যার সমাধানে সৃজনশীল চিন্তা, ছোটভাবে শুরু করার সাহস, দায়িত্ব নেয়ার মানসিকতা।
পঞ্চমত, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন দরকার। শিক্ষকদের শুধু পড়িয়ে পারিশ্রমিক নেয়া নয়, বরং ছাত্রদের ভবিষ্যৎ জীবনের প্রস্তুতির গাইড হওয়া উচিত। তাদের মধ্যে মানবিকতা, সৃজনশীলতা, সময়ানুগ চিন্তাভাবনা এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা আবশ্যক।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিস্ময়কর অগ্রগতির এই যুগে দক্ষতা ছাড়া কেবল ডিগ্রির কোনো মূল্য নেই। একদিকে যেমন বেকারত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে আবার শিল্পপ্রতিষ্ঠান বা প্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান দক্ষ লোক পাচ্ছে না। এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে হবে। সরকারি-বেসরকারি সকল পর্যায়ে শিক্ষানীতি, চাকরির নীতিমালা এবং প্রশিক্ষণের ওপর জোর দিতে হবে।
এই লেখার মূল বক্তব্য হচ্ছে, দেশে শুধু ডিগ্রিধারী মানুষ নয়, দরকার দক্ষ এবং মানবিক গুণসম্পন্ন মানুষ। যারা শুধু নিজের নয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করবে। আমাদের এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলতে হবে, যারা সমস্যাকে ভয় না পেয়ে সমাধান করতে পারবে, যারা পুঁথিগত বিদ্যার পাশাপাশি বাস্তবজ্ঞান অর্জন করবে, যারা উচ্চশিক্ষার গর্বে নয়, জীবনের উদ্দেশ্যে অবিচল থাকবে।
মানুষের মানবিক গুণাবলি একটি জাতির সামষ্টিক চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একটি শিক্ষা ব্যবস্থা যদি মানুষকে দায়িত্বশীল, সহানুভূতিশীল, পরোপকারী ও নৈতিকতাবান করে তুলতে না পারে, তবে সে শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক ঘাটতি রয়ে যায়। আমাদের আজকের প্রজন্ম যদি শুধু চাকরিপ্রার্থী থেকে যায়, যদি তারা সমাজের জন্য কিছু করার মানসিকতা না গড়ে তোলে, তবে উন্নত ডিগ্রি থাকা সত্ত্বেও জাতি হিসেবে আমরা পিছিয়ে থাকব।
আমাদের এখন প্রয়োজন একটি পরিপূর্ণ মানবসম্পদ উন্নয়নের রূপরেখা। শিক্ষাকে শুধুমাত্র সার্টিফিকেট অর্জনের পন্থা হিসেবে না দেখে জীবন গড়ার হাতিয়ার হিসেবে দেখতে হবে। একজন মানুষকে শুধু ডিগ্রিধারী করে নয়, দক্ষ ও মানবিক করে গড়ে তুলতে হবে। একজন মানুষের মধ্যে যদি থাকে কাজের দক্ষতা, হৃদয়ের কোমলতা, চিন্তার গভীরতা এবং দায়িত্ববোধ তবে সে-ই হবে জাতির প্রকৃত সম্পদ। সমাজ ও রাষ্ট্র তার হাতেই নিরাপদ। উন্নয়ন তখনই টেকসই হবে, যখন শিক্ষিত মানুষের সাথে সাথে দক্ষ এবং মানবিক মানুষের সংখ্যা বাড়বে। শুধু ডিগ্রি নয়, আমাদের চাই মানুষ যারা কাজ জানে, মানুষকে বোঝে এবং দেশকে ভালোবাসে।

আব্দুল্লাহ্ সাহেদ : ব্যাংকার, প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন