বৈষম্যে ভরা চরাঞ্চলের শিক্ষাজীবন
আশফাকুর রহমান রাসেল

সভ্যতার যুগে প্রতিটি মানুষেরই ছাত্রজীবনের ভিন্ন ভিন্ন স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা আছে। কারো সুখের, কারো কষ্টের। এই ভিন্নতা বা বৈচিত্র্য নির্ভর করে পারিবারিক, পারিপার্শ্বিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক অবস্থার ওপর। পাহাড়ি ও চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রা সমতলভূমির চেয়ে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং ও সংগ্রামী। শিক্ষাজীবনের এ বৈষম্য অত্যন্ত নির্মম ও চিরন্তন। দুর্বিষহ বাস্তবতার সাথে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বেড়ে উঠে চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নারায়ণপুর এবং শিবগঞ্জ উপজেলার পাঁকা ও দুর্লভপুর (আংশিক) ইউনিয়ন চরাঞ্চলে অবস্থিত। সেখানে প্রায় পঞ্চাশ হাজারেরও অধিক মানুষের বসবাস। এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জীবনযাত্রার নিভৃত বাস্তবতা অনেকেরই অজানা। এ লেখায় সেদিকেই আলোকপাত করব আজ।
চরাঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা
ভৌগোলিক বাস্তবতার সাথেই শিক্ষাজীবনের বাস্তবতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই চরাঞ্চলে ভৌগোলিক অবস্থা জানা দরকার। বাংলাদেশের পদ্মা আর ভারতের গঙ্গা নদীর মিলন ঘটেছে দুর্লভপুর ইউনিয়নের হাসানপুর নামক যে স্থানে, সেখানে পাঁচ শতাধিক বছর আগে এক বিশাল চর জেগে উঠে। কাদামাটি আবৃত এই উর্বর ভূমি কৃষকদের চোখে পড়লে তারা ফসল উৎপাদনের কথা ভাবে। কাদামাটিকে এ অঞ্চলের মানুষের পাঁক বলে থাকে। কথিত আছে, এজন্যও অঞ্চলের নামকরণ ‘চর পাঁকা’।
কলকাতা-মুর্শিদাবাদ-নবাবগঞ্জ এলাকার মানুষ পদ্মা নদীর এ অংশটি দিয়ে বড় বড় নৌকায় চড়ে যাতায়াত করতেন। যাত্রাপথে কাদামাটি ভরপুর বিশাল চর মাঝিদের চোখে পড়ে। এরপর কৃষকরা বন্যা নামার পর এখানে এসে ভেজা মাটিতে মাসকলাই বা কালাই বীজ ছিটিয়ে / বপন করে চলে যেতেন। মাসে দু’একবার গিয়ে ফলন দেখতেন। ফসল পাকলে লোকজন তুলে নিয়ে আসতেন। বিনা চাষে, বিনা শ্রমে, বিনা খরচায় প্রচুর পরিমাণ কালাই ঘরে তুলতেন। মালিকানাবিহীন এ বিশাল চরাঞ্চল দখল করে শুধুমাত্র বীজ ছিটিয়ে মোটা অঙ্কের ফসল বা অর্থ কামানোর আশায় ঘর বাঁধা শুরু হয় এ চরে। এইভাবেই গড়ে উঠে জনবহুল চরাঞ্চল।
পাঁকা-নারায়ণপুরের মাটি যেমন প্রাকৃতিকভাবে উর্বর, তেমনই এ অঞ্চলের শিশুদের মেধা উর্বর ও প্রখর। এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনে দেশের বিভিন্ন জায়গায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন সুনামের সাথে। তবে এসব সফল ব্যক্তিদের পেছনের অর্থাৎ শিক্ষাজীবনের বৈষম্য ও বাস্তবতা অনেক দুর্গম।
শিক্ষা ব্যবস্থার অতীত-বর্তমান
চরাঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা বর্তমানের চেয়ে অতীত বেশি উজ্জ্বল। পাঁকা নারায়ণপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় তৎকালীন সময়ের স্বনামধন্য এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যা ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত। সেসময় দূর-দুরান্ত থেকে অনেক শিক্ষার্থী এই স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়তে আসতেন। অবশ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বনামধন্য হয় শিক্ষকম-লীর গুণগত মানে। পাঁকা হাই স্কুল থেকে শিক্ষা অর্জন করে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন অনেকেই। অনেকেই বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শেষে অবসরে আছেন, আবার অনেকে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন।
কালের পরিক্রমায় এই অঞ্চলের শিক্ষায় ব্যাপক প্রসার হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক, শিক্ষার্থীর সংখ্যা ও শিক্ষা ও পাসের শতকরা হার বৃদ্ধি পেয়েছে। অস্বীকার করার উপায় নাই যে, শিক্ষার মান যুগ অনুযায়ী নি¤েœ আর শিক্ষার্থীদের বৈষম্য অনেক ঊর্ধ্বে।
প্রাথমিক শিক্ষার বাস্তবতা
চর পাঁকায় ১৯৪৭ সালে যে প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়, সেটির নাম ‘৮৩নং পাঁকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। বর্তমানে এ অঞ্চলে সরকারি-বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৫টির অধিক, শিক্ষক শতাধিক, আর শিক্ষার্থী কয়েক হাজার।
প্রতিযোগিতার এই যুগে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যথেষ্ট বেড়েছে, তবে তুলনামূলক শিক্ষকের সংখ্যা অপ্রতুল। তার চেয়েও নগণ্য গুণী ও আদর্শবান শিক্ষকের সংখ্যা! রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, স্থানীয় পেশীশক্তি, কালো টাকার দাপটে সুশিক্ষিত ও আদর্শের যে পরাজয় দুনিয়াব্যাপী, তার প্রতিফলন চরাঞ্চলে একটু বেশিই।
সময়ের টানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় প্রতিটি শিশুকে ভর্তি করা হয়। প্রায় শতভাগ শিশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির পেছনে দুটি বিষয় প্রধান ভূমিকা রাখে। এক. উপবৃত্তির টাকা পাওয়া এবং দুই. বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ানো। চরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশিরভাগ ছাত্রদের দায়িত্ব হলো, মাঠে বাপকে লাহারি (সকালের নাস্তা) দিয়ে এসে ক্লাসে যাওয়া। আর সংসারের জরুরি কাজ সেরে বিদ্যালয় বজায় রাখা।
ভয়ানক বাস্তবতা হলো, এ অঞ্চলের প্রাথমিক শিক্ষার মান অত্যন্ত দুর্বল! প্রায় সকল বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিজেরাই পড়াশোনার বাইরে। সংসার চালানোর তাগিদে তারা কৃষি অথবা অন্য কাজে বেশি মনোযোগী। সেই কাজের পাশাপাশি চাকরি বজায় রাখা আর বেতন বাঁচানোর জন্য পরীক্ষা নেয়া তাদের প্রধান কাজ। একই অভিযোগ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও পাওয়া যায়। পাসের হার ঠিক রাখার জন্য যে কোনো অসৎ পথ ব্যবহার করা হয়। এজন্য পঞ্চম শ্রেণী পাস করা বেশিরভাগ শিক্ষার্থী নিজের নাম ঠিকানা বাংলা এবং ইংরেজি ভাষায় শতভাগ শুদ্ধভাবে লিখতে পারে না।
চর এলাকায় রাস্তার প্রকৃতি এতই দুর্গম যে, সহজে কেউ যাতায়াত করতে পারে না। শিবগঞ্জ উপজেলা শিক্ষা অফিসার বা সহকারী শিক্ষা অফিসার এ চরাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কবে পরিদর্শন করেছেন তা বলা মুশকিল। উপজেলা সদর থেকে এ অঞ্চলে কোনো পরিদর্শক আসার কয়েকদিন আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হয়। এর ফলে বিদ্যালয়ের বাস্তবতা আড়ালেই থেকে যায়। বিনা নোটিশে যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুপুর ১টার পরে উপস্থিত হলে শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কারো দেখা পাওয়া যাবে না। এছাড়াও নেই কোনো কোচিং বা প্রাইভেট হোম। বিধায়, এখানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মৌলিক অধিকার শিক্ষা অর্জনে বৈষম্য ও অবহেলার শিকার।
মাধ্যমিক শিক্ষার বাস্তবতা
প্রাথমিকের পাঠ শেষ করে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভর্তির হার অত্যন্ত কম চরাঞ্চলে। প্রায় ৫০ ভাগ শিশু পঞ্চম শ্রেণী পাস করে ঠেলেঠুলে। তাদের মধ্যে অধিকাংশই আবার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। পারিবারিক অনটনের কারণে উপার্জনের দিকেই ধাবিত হতে হয় তাদের।
এখানকার চরাঞ্চলে দুটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছেÑ ‘পাঁকা নারায়ণপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়’ ও ‘চর পাঁকা উচ্চ বিদ্যালয়’। বর্তমানে পাঁকা নারায়ণপুর পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ের চেয়ে চর পাঁকা উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কিছুটা ভালো বলা যায়, তবে যুগোপযোগী নয়। ভালো শিক্ষক দূর-দুরান্ত থেকে এসে এ প্রত্যন্ত অঞ্চলে চাকরি করতে চান না। এমনকি এ অঞ্চলের যারা ভালো শিক্ষার্থী ছিলেন, তারাও কর্মক্ষেত্রের কারণে চরে থাকতে চান না। এ অঞ্চলের অনেকেই ভালো শিক্ষক হিসেবে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন জেলায় কর্মরত আছেন। তারা সুনামের সাথে শিক্ষকতা করছেন এবং কর্মএলাকায় পরিবারসহ বসবাস করছেন। এক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে অনেকের নাম উল্লেখ করা যেতে পারে। তবে সেদিকে যেতে চাচ্ছি না।
নদী ভাঙনকবলিত এলাকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর অবস্থা, শিক্ষা উপকরণসহ অন্যান্য সুবিধা একেবারেই অপ্রতুল। যেটুকু আছে সেটুকুও জরাজীর্ণ, যা শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ বলা যায় না।
এমন বৈষম্যের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা নিজের চেষ্টায় এবং সৃষ্টিকর্তার রহমতে এসএসসি পাস করে। এরই মধ্যে সিংহভাগ ছাত্রীদের বিয়ে হয়ে যায়। এসএসসি পাসের পর মূলত শুরু হয় এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের নির্মম শিক্ষাজীবন।
কলেজের নির্মম শিক্ষাজীবন
চরাঞ্চলের একমাত্র কলেজ ‘নারায়ণপুর আদর্শ মহাবিদ্যালয়’। এত প্রতিকূলতার মাঝেও যারা এসএসসি পরীক্ষায় মোটামুটি ভালো ফল করেন, তাদের স্বপ্ন থাকে একটি ভালো কলেজে পড়ার। সে সুযোগ অনেকেরই জুটে না। যাদের জুটে তাদের দৌড় শিবগঞ্জ বা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহর পর্যন্ত। রাজশাহী শহরে থেকে পড়াশোনা করার সুযোগ খুবই কম।
চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শহরেরর আশপাশে স্বল্প খরচে থাকা যায়, এমন হোস্টেল বেছে নেন। প্রতি মাসের খরচ জোগান দেয়ার সামর্থ্য বেশিরভাগ পরিবারের নেই। এজন্য বাড়ি থেকে চাল নিয়ে এসে ডাইনিং চালান। অনেকেই কিছুদিনের জন্য জেলার বাইরে গিয়ে রাজমিস্ত্রী বা ফেরিওয়ালার কাজ করে উপার্জন করেন। সেই টাকা দিয়ে পরবর্তী দুই-তিন মাস পড়াশোনার খরচ বহন করেন। আবার অনেকে নিজ গ্রামে কৃষিকাজ থেকে উপার্জিত আয় দিয়ে কোনোরকম পড়াশোনা চালিয়ে যান। ফলে ডিগ্রি অর্জন হলেও প্রতিযোগিতার এই যুগে যথার্থ শিক্ষা থেকে তারা পিছিয়ে পড়েন। আরো সহজ করে বললে, শিক্ষাসনদ অর্জন হয় কিন্তু যোগ্যতা তৈরি হয় না! যার দরুন নেতিবাচক ভূমিকা পড়ে কর্মক্ষেত্রে।
শহরের শিক্ষার্থীদের সাথে চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কি বৈচিত্র্যময় পার্থক্য! শহরের শিক্ষার্থীরা অভিভাবকের উপদেশ-যতœ, প্রাইভেট শিক্ষক, কোচিং, পরিবহন, খাবার, পোশাক, উপকরণ, বিনোদন সবকিছুতেই এগিয়ে! আর চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সবকিছুতেই বঞ্চিত অবহেলিত ও বৈষম্যের শিকার। এই বৈষম্য প্রকৃতির। এই বৈষম্য জন্মান্তরের। শহরের শিক্ষাজীবন আর চরাঞ্চলে শিক্ষাজীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন। অভিন্ন শুধু পরীক্ষার মানদ-। বঞ্চিত আর বৈষম্যের অথই পাথারে জ্বলজ্বলে পদ্মফুল হয়ে ফুটে উঠে চরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।
মোহা. আশফাকুর রহমান রাসেল : সামাজিক ও গণমাধ্যম কর্মী