দেশের দুটি অঞ্চলে অ্যানথ্রাক্স শনাক্তের খবর মিলছে। যদিও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখন পর্যন্ত এ রোগ শনাক্তের খবর নেই। এ রোগের বিস্তারিত নিয়ে লিখেছেন প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটির লাইভস্টক বিভাগের প্রধান ডা. রাজিন বিন রেজাউল (বিভিসি রেজি. নং ৫৮৩৬)

অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে করণীয়
‘তড়কা’ বা আন্তর্জাতিকভাবে অ্যানথ্রাক্স নামে পরিচিত এই রোগটি গবাদিপশুর জন্য এক মারাত্মক সংক্রমণ। বাংলাদেশে বিশেষ করে বর্ষার পরবর্তী সময় ও জলাবদ্ধ ভূমিতে এর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। তবে এ রোগ প্রতিরোধে খামারিসহ সংশ্লিষ্ট সবার মধ্যে জনসচেতনতার দরকার রয়েছে।
রোগের কারণ ও সংক্রমণ পন্থা
রোগের কারণ একটি ব্যাকটেরিয়া (Bacillus Anthraces), যা মাটিতে স্পোর হিসেবে দীর্ঘকাল টিকে থাকতে পারে।
সংক্রমণ সাধারণত ঘটে— ১ সংক্রামিত মাটি, ঘাস বা খাদ্য দ্বারা; ২. মৃত পশুর দেহ থেকে ছড়িয়ে পড়া স্পোর এবং ৩. সংক্রামিত মৃতদেহ বা পশুর দেহাংশ ছড়িয়ে গেলে।
রোগ প্রাণী মাত্রই দ্রুত প্রসার হয় এবং গুরুতর অবস্থায় দ্রুত মৃত্যুর দিকে যায়।
লক্ষণ
অ্যানথ্রাক্স রোগের সাধারণ লক্ষণসমূহ হচ্ছে— জ্বর, বমিভাব, শ্লথতা, খাদ্য গ্রহণে অনিচ্ছা; শ্লেষ্মা ও ফোলা গলা; শ্বসনপ্রত্যাহার প্রদাহ; রক্তবাহী নির্গমন ও চামড়ায় ফুসকুড়ি বা দাগ।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
আক্রান্ত পশুকে দ্রুত রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারি চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যেতে হবে। রোগ নির্ণয় ও ব্যবস্থাপনায় অ্যান্টিবায়োটিক (যেমন পেনিসিলিন, ডক্সিসাইস্লিন ইত্যাদি) প্রয়োগ হয় (রেজিস্টার্ড ভেটেরিনারির ডাক্তারের পরামর্শমতো)
এছাড়া মৃত পশুর দেহ খোলা জায়গায় না ফেলে মাটির গভীরে (পর্যাপ্ত ডিফেনস মাপ রেখে) পুঁতে দিতে হবে। মৃত পশুর দেহ যে কোনো শকুন বা কুকুরের দ্বারা খাওয়া রোধ করতে হবে।
রোগ প্রতিরোধে নিয়মিত টিকা দিতে হবে। পশুর বয়স ৬ মাস হলে প্রথম টিকা দেওয়া উচিত। পরে প্রতি বছর পুনরায় টিকা দিতে হবে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার প্রেক্ষাপট ও চ্যালেঞ্জ
তথ্যা অনুযায়ী, জেলা প্রাণিসম্পদ অফিসে জনবল সংকট রয়েছে। ৬৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩০ জন।
এছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় উপজেলা প্রাণিসম্পদ ও ভেটেরিনারি বিভাগ কার্যকর হলেও অধিক সময় জনবল ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা অনুভব করছেন।
আর চাঁপাইনবাবগঞ্জে গরুর সংখ্যা ৫ লক্ষাধিক। তাই প্রাদুর্ভাবের সময় দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক সাড়া দিতে জনবল ও সরঞ্জামের অভাব রয়েছে।
সুপারিশ ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ
১. টিকাদান কার্যক্রম বাড়ানো ও নিশ্চিত করা— সকল গরুকে বয়স অনুযায়ী নিয়মিত টিকা দিতে হবে।
২. সচেতনতা বৃদ্ধি— খামারিকে সচেতন করতে কর্মশালা, ব্রোশিউর, স্থানীয় সংবাদপত্রে প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. জরুরি স্যানিটেশন পদক্ষেপ— মৃত পশুর দেহ দ্রুত সুরক্ষিতভাবে নিষ্কাশন ও পুঁতে ফেলার ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. মানব ও পশু স্বাস্থ্য বিভাগের সমন্বয়— রোগ সম্ভাব্য দ্রুত চিহ্নিত করে জনসুরক্ষায় পদক্ষেপ নিতে হবে।।
৫. যন্ত্রসামগ্রী ও যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন— উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসগুলোতে পর্যাপ্ত ও দ্রুত সাড়া দেয়ার সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
৬. মানবসংখ্যা বৃদ্ধি ও দক্ষ জনবল নিয়োগ— বিশেষ করে প্রাণিসম্পদ দপ্তরে যাতে পর্যাপ্ত তদারকি করা যায়, সেজন্য কর্মী সংখ্যার পাশাপাশি দক্ষ জনবল নিয়োগ দিতে হবে।
উপসংহার
গরুর তড়কা রোগ যদি দ্রুত ও সমন্বিতভাবে প্রতিরোধ না করা হয়, তাহলে খামারিতে ব্যাপক ক্ষতি এবং সমাজ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে জনবল সংকট ও সম্পদের সীমাবদ্ধতা মোকাবিলা করে যথাযথ টিকা, সচেতনতা ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।