সম্ভাবনার মোবাইল, বিপদের ফাঁদে প্রজন্ম
তৌফিকুল ইসলাম
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটরের মধ্যে একসময় আম নিয়ে এক ধরনের ‘কনটেন্ট যুদ্ধ’ শুরু হয়েছিল। কেউ দাবি করছে, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জই আমের রাজধানী’। আবার কেউ পাল্টা বলছেন, ‘নওগাঁই আমের রাজধানী’।
সম্প্রতি এই মতবিরোধ ক্রমে পরিণত হয়েছে তর্কে, পরে অপবাদে। এমনকি বেশ কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাজে আকার ইঙ্গিত ও একে অপরকে দোষারোপ পর্যন্ত গড়িয়েছে।
একটি ফল, একটি জেলার ঐতিহ্য, যা হতে পারত গর্ব ও ঐক্যের প্রতীক। সেটিই এখন বিভেদের কারণ হয়ে উঠছে। এ ঘটনাটি শুধুই একটি উদাহরণ নয়; এটি আসলে আমাদের সময়ের এক বড় বাস্তবতা।
জনপ্রিয়তার দৌড়ে নৈতিকতার হার
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আজ এমন এক জায়গা, যেখানে ভিউ, লাইক ও ফলোয়ারই যেন সাফল্যের মানদণ্ড।
অনেক তরুণ এখন কনটেন্ট তৈরি করে অর্থ উপার্জনের আশায় ছুটছে যা ইতিবাচক দিক। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এর বড় একটি অংশ জনপ্রিয়তার দৌড়ে নেমে নৈতিকতা ভুলে যাচ্ছে।
একজন কনটেন্ট ক্রিয়েটর যখন অন্যকে হেয় করে নিজের প্রচার বাড়াতে চায়, তখন প্রযুক্তি নয়, মানুষই দোষী হয়। ভিউ পাওয়ার জন্য বিভ্রান্তিকর তথ্য, কটু মন্তব্য, অনুচিত ভাষা ব্যবহার এসব আজ যেন সাধারণ হয়ে গেছে।
ফলে সৃজনশীলতার বদলে তৈরি হচ্ছে বিভেদ, প্রতিযোগিতার বদলে সৃষ্টি হচ্ছে ঘৃণা। আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মনে রাখতে হবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু চরিত্র স্থায়ী। নৈতিকতা হারিয়ে পাওয়া সাফল্য আসলে এক ধরনের পরাজয়।
মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন মানুষের মত প্রকাশ, প্রতিযোগিতা, এমনকি জনপ্রিয়তা অর্জনের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার না জানলে সম্ভাবনার মোবাইলই হয়ে উঠছে বিপদের ফাঁদ।
হাতের মুঠোয় দুনিয়া, তবু মানুষ একা। আজকের পৃথিবী যেন হাতের মুঠোয় বন্দি। সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শুরু হয় স্ক্রিনে চোখ রাখার খবর, নোটিফিকেশন, ফেসবুক বা টিকটকের স্ক্রলিং। কখন যে সময় চলে যায়, কেউ টেরই পায় না।
যে শিশুটি একসময় মাঠে দৌড়ে বেড়াত, এখন সে ব্যস্ত মোবাইল গেমে। যে কিশোর একসময় বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিত, এখন ভার্চুয়াল চ্যাটে হারিয়ে যায়। এমনকি বড়রাও এখন খবরের কাগজের বদলে নিউজফিডে চোখ রাখে। পরিবারের সঙ্গে গল্প না করে ফোনে ব্যস্ত থাকে।
একই ঘরে চারজন মানুষ কেউ রান্নাঘরে, কেউ বারান্দায়, কেউ বিছানায় কিন্তু সবার হাতে মোবাইল ফোন। আলো জ্বলছে, শব্দ বাজছে, কিন্তু সম্পর্কের উষ্ণতা হারিয়ে যাচ্ছে। মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়লেও মনের মধ্যে দূরত্ব বাড়ছে। এ এক অদ্ভুত বৈপরীত্য।
মানসিক চাপ ও একাকিত্বের বেড়াজাল
মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, বর্তমানে তরুণ ও কিশোরদের মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে ডিজিটাল নির্ভরতা।
অতিরিক্ত সময় ফোনে কাটানোর ফলে মনোযোগের ঘাটতি, ঘুমের সমস্যা, হতাশা ও একাকিত্ব বেড়ে যাচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ২৭ শতাংশ মানুষ মোবাইল আসক্তির শিকার, তার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই কিশোর-তরুণ। বাংলাদেশেও পরিস্থিতিও ভিন্ন নয়।
শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফোনে সময় কাটায়, যার প্রভাব পড়ছে তাদের ফলাফল, পারিবারিক সম্পর্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যে।
একসময় যারা বই পড়ত বা খেলাধুলা করত, তারা এখন স্ক্রিনে চোখ রাখে সারাদিন। মোবাইল ফোন তাদের আনন্দ দিলেও কেড়ে নিচ্ছে বাস্তব জীবনের সুখ।
প্রযুক্তির ইতিবাচক দিক সুযোগের নতুন দিগন্ত
তবে শুধু নেতিবাচক দিক বললে অন্যায় হবে। মোবাইল ফোনই আজ অনেকের জীবনে পরিবর্তন এনেছে। গ্রামের কৃষক এখন মোবাইলে আবহাওয়ার খবর জানেন, দাম জানেন, বিক্রি করেন অনলাইনে। শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করছে, চাকরিপ্রার্থীরা তথ্য পাচ্ছে, উদ্যোক্তা ব্যবসা চালাচ্ছে ঘরে বসে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার অনেক তরুণ এখন ইউটিউব, ফেসবুক বা টিকটকে ইতিবাচক কনটেন্ট তৈরি করে নিজের দক্ষতা দেখাচ্ছে। কেউ স্থানীয় সংস্কৃতি তুলে ধরছে, কেউ ইতিহাস, কেউ আম শিল্পের প্রচারণা করছে।
এটাই মোবাইলের আসল শক্তি— জ্ঞান, যোগাযোগ ও অনেক উদ্যেক্তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা।
প্রযুক্তি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি হতে পারে আশীর্বাদের মতো এক উপহার। তবে অপব্যবহার করলে সেটিই হয়ে ওঠে ধ্বংসের কারণ।
অপকারিতা যখন প্রযুক্তি আমাদের ব্যবহার করে
মোবাইল ফোনের সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে ‘সময় নষ্ট ও মানসিক বিভ্রান্তি’। অতিরিক্ত ফোন ব্যবহার চোখের ক্ষতি, ঘুমের ব্যাঘাত, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, এমনকি সামাজিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করছে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব ভয়াবহ। তারা দ্রুত রাগ করে, মনোযোগ হারায়, এবং খেলাধুলা থেকে দূরে সরে যায়।
তাছাড়া অনলাইন প্রতারণা, ভুয়া খবর, অশালীন কনটেন্ট ও নৈতিক অবক্ষয়ও এর অংশ। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে এখন এক ক্লিকেই কেউ কারো চরিত্র হনন করতে পারে, যা সামাজিক অশান্তির কারণ হচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রযুক্তি নয়, আমাদের চিন্তা-চেতনা ও মূল্যবোধের সংস্কার জরুরি। আজ আমরা হারাচ্ছি অবসর সময়কে, ফোনের আসক্তিতে নষ্ট করে। তাই তরুণদের উচিত, দায়িত্ববোধের সঙ্গে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা; যেন এটি আমাদের, চরিত্র ও সমাজকে দুর্বল না করে।
মুক্তির পথ সচেতনতা ও সীমিত ব্যবহার
প্রযুক্তি কখনোই আমাদের শত্রু নয়; আমাদের আচরণই তাকে বন্ধু বা শত্রু বানায়। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় মোবাইল ব্যবহার করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, বই পড়া বা প্রকৃতির মাঝে হাঁটতে যাওয়া এসব ছোট ছোট অভ্যাসই আমাদের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনতে পারে।
অভিভাবকদের উচিত শিশুদের হাতে অল্প বয়সে স্মার্টফোন না দেওয়া, বরং তাদের বই, খেলাধুলা ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করা। স্কুলগুলোতেও ডিজিটাল শিক্ষা দেওয়া দরকার, যাতে শিশুরা শেখে কীভাবে প্রযুক্তিকে কাজে লাগাতে হয়, আসক্ত হতে নয়।
সামাজিক ঐক্য ফিরিয়ে আনার সময়
চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের মধ্যে সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা কখনো কখনো প্রযুক্তিকে ঐক্যের পরিবর্তে বিভেদের অস্ত্র বানিয়ে ফেলি। কিন্তু আমাদের এই প্রতিযোগিতা যদি হতো ‘সৃজনশীলতা ও উন্নতির’, তাহলে দুই জেলা মিলেই বাংলাদেশের গর্ব হতে পারত।
সময় এসেছে আমরা মোবাইলকে ব্যবহার করব ইতিবাচক কাজে— একতা, সংস্কৃতি, জ্ঞান ও মানবিকতার প্রচারে।
শেষ কথা
মোবাইল ফোন মানবজাতির এক বিস্ময়কর উদ্ভাবন। এটি আমাদের পৃথিবীকে কাছে এনেছে, জ্ঞান ও কর্মসংস্থানের নতুন দ্বার খুলেছে। কিন্তু অতিরিক্ত নির্ভরতা আমাদের মানবিক সম্পর্ক, মানসিক শান্তি ও বাস্তবতা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
এখনই সময় ফিরে দেখার, আমরা কি মোবাইল ব্যবহার করছি, নাকি মোবাইলই আমাদের ব্যবহার করছে?
সচেতন ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা যদি ভারসাম্য রাখতে পারি, তবে মোবাইল হবে সম্ভাবনার হাতিয়ার। আর যদি না পারি তবে সেটিই হবে আমাদের প্রজন্মের বিপদের ফাঁদ।
তৌফিকুল ইসলাম : লেখক তাসীন মেটালিক ক্রেস্ট হাউসের স্বত্বাধিকারী এবং সম্পাদক, স্বর্ণালী সাহিত্য পরিষদ