নারী উদ্যোক্তা দিলনাজ খানমের অনুপ্রেরণার গল্প
তৌফিকুল ইসলাম

তিনি শুধু একজন নারী উদ্যোক্তা নন তিনি এক চলমান অনুপ্রেরণা, এক প্রেরণার আলো, এক সাহসী কণ্ঠস্বর। তিনি প্রমাণ করেছেন স্বপ্ন আর পরিশ্রম মিললেই অসম্ভব বলে কিছু থাকে না। দিলনাজ খানম সেই নারী, যিনি নিজের হাতের সৃজনশীলতাকে পুঁজি করে গড়ে তুলেছেন সম্ভাবনার এক দিগন্ত।
তাঁর হাতের ছোঁয়ায় সাধারণ জিনিস হয়ে ওঠে অসাধারণ, তাঁর চিন্তায় গড়ে ওঠে সৃজনশীলতার এক নতুন অধ্যায়। প্রতিটি কাজে মিশে থাকে তাঁর ভালোবাসা, পরিশ্রম আর আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি। যেখানেই তিনি ছোঁয়া দেন, সেখানেই ফুটে ওঠে নতুন স্বপ্নের রঙ।
জীবনের প্রতিটি বাঁকে দিলনাজ লড়েছেন কখনো পরিবারের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে, কখনো সমাজের পূর্বধারণার সঙ্গে। কিন্তু প্রতিবারই তিনি ফিরে এসেছেন আরো দৃঢ়, আরো আত্মবিশ্বাসী হয়ে। সমাজের বাঁধা পেরিয়ে নিজের পরিচয় নিজেই গড়ে নিয়েছেন, আর দেখিয়েছেন নারী যদি চায়, তবে ঘরের দেয়াল ভেদ করে সূর্যের আলোয় নিজের জায়গা তৈরি করতে পারে।
দিলনাজের যাত্রা শুর হয়েছিল একেবারে ছোট পরিসরে এক মুঠো সাহস আর অগাধ বিশ্বাস নিয়ে। সেই ছোট স্বপ্নই আজ পরিণত হয়েছে বিশাল সম্ভাবনার দিগন্তে। তাঁর হাতের কাজ, দৃষ্টিভঙ্গি আর উদ্যোক্তা মনোভাব সবকিছুতেই ফুটে ওঠে এক নিখাদ আন্তরিকতা। প্রতিটি পণ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক টুকরো ভালোবাসা, এক টুকরো গল্প, আর এক অদম্য ইচ্ছাশক্তি।
আজ দিলনাজ শুধু নিজের জীবনের নয়, আরো বহু নারীর জীবনে অনুপ্রেরণার প্রতীক। তিনি শিখিয়েছেন সাফল্য ভাগ্যে নয়, আসে সাহসে, অধ্যবসায়ে আর বিশ্বাসে। তাঁর চারপাশে গড়ে উঠেছে নতুন প্রজন্মের নারীরা, যারা স্বপ্ন দেখতে জানে, পরিশ্রম করতে জানে, নিজেকে বিশ্বাস করতে জানে।
দিলনাজ খানম একজন নারী, যিনি সমাজের চোখে নারীর অবস্থানকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, “নারী” মানে দুর্বলতা নয়, বরং এক অনন্য শক্তি। তাঁর গল্প শুধুই সাফল্যের নয়, এটা আত্মবিশ্বাস, সংগ্রাম আর ভালোবাসার এক অনবদ্য উপাখ্যান যেখানে প্রতিটি অধ্যায়ে লেখা আছে, “আমি পারি, কারণ আমি বিশ্বাস করি।”
১৯৮৫ সালের ১৪ মার্চ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার রহনপুর স্টেশনপাড়ায় জন্ম নেন দিলনাজ খানম। বাবা নুরুল হুদা খান, পেশায় ব্যবসায়ী, আর মা নুরজাহান বেগম গৃহিণী। চার ভাইবোনের সংসারে দিলনাজ ছিলেন তৃতীয় তিন বোন, এক ভাইয়ের ভালোবাসায় ভরা পরিবার।
ছোটবেলায় তিনি ছিলেন ভীষণ দুষ্টু আর কৌতূহলী। আশেপাশের সবকিছু নিয়েই তাঁর আগ্রহ কেন, কীভাবে, কোথা থেকে এই প্রশ্নগুলো মাথায় ঘুরত সারাক্ষণ। একবারের ঘটনা আজও তিনি ভুলতে পারেন না। বাবা নতুন একজোড়া স্যান্ডেল কিনে দিয়েছিলেন। আনন্দে খুশিতে ছোট্ট মেয়েটা পায়ে গুঁজে দৌড়ে বেড়াল সারা পাড়া জুড়ে। কিন্তু খেলতে খেলতে ভুলে গেল স্যান্ডেল কোথায় রেখেছে। সন্ধ্যায় বাবা যখন জিজ্ঞেস করলেন, সে ভয়ে বলল
“বাবা, ভূত নিয়ে গেছে স্যান্ডেলটা।” বাবা হাসলেন, তারপর মৃদু গলায় বললেন
“মিথ্যা কখনো বলিস না মা। সত্য মানুষকে বড় করে।”
সেই দিনটি দিলনাজের মনে গেঁথে রইল চিরদিনের মতো জীবনের প্রথম পাঠ, সত্যের শিক্ষা।
শৈশবে তাঁর আরেক মজার অভ্যাস ছিল মায়ের রান্নাঘরে চুপিচুপি ঢুকে হরলিক্স খাওয়া। ভাইকে সঙ্গে নিয়ে দু’জনই মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে হরলিক্সের বোতল খুলে আঙুল ডুবিয়ে খেত। মা ধরা পড়লে বকতেন, কিন্তু হাসি চেপে রাখতে পারতেন না। মা নুরজাহান প্রায়ই বলতেন,
“এই মেয়েটা বড় হয়ে কিছু একটা আলাদা করবে।”
মায়ের সেই কথাই যেন ভবিষ্যদ্বাণী হয়ে গিয়েছিল।
প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন রহনপুর ২ নম্বর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ক্লাসে মনোযোগী, আবার খেলাধুলায়ও সমান আগ্রহী। চিত্রাঙ্কন, গল্প বলা, কবিতা আবৃত্তি সবকিছুতেই ছিল তাঁর স্বাভাবিক প্রতিভা। ছোটবেলায় কাগজ দিয়ে নানান জিনিস বানাতেন গোলাপ, পাখা, ছোট ঘর। সবাই অবাক হত তাঁর নিপুণতায়।
প্রাথমিকের পরে ভর্তি হন রহনপুর রাবেয়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখানেই তাঁর জীবনের আসল গঠন শুরু হয়। স্কুল জীবনে তিনি ছিলেন গার্লস গাইড দলের সক্রিয় সদস্য। ক্যাম্পে গিয়ে নতুন নতুন জিনিস শেখা, নেতৃত্বের প্রশিক্ষণ নেওয়া সবই তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রিয় শিক্ষক সুলতান স্যার, জামান স্যার এবং তাইবুন নেসা ম্যাডাম তাঁকে সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন। একদিন সুলতান স্যার বলেছিলেন,
“স্বপ্না, তুমি শুধু নিজের জন্য না একদিন অনেকের অনুপ্রেরণা হবে।”
সেই কথাটি যেন ভবিষ্যদ্বাণী হয়ে গেল।
একবার স্কুলে সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় কবিতা আবৃত্তি করে প্রথম হন। এরপর নাটকে অভিনয়েও প্রথম। নাটক চলাকালে একবার মঞ্চে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যান, কিন্তু জ্ঞান ফেরার পর প্রথম কথাই ছিল
“স্যার, আমি আবার মঞ্চে উঠব।”
এসএসসি শেষে ভর্তি হন রংপুর ইউসুফ আলী কলেজে, এরপর রানিহাটি কলেজে ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সামাজিক কর্মকান্ডেও বেশ সক্রিয়। তিনি বলতেন “শুধু বইয়ের জ্ঞান মানুষকে বড় করে না, মানুষকে বড় করে অভিজ্ঞতা আর সেবার মানসিকতা।”
বন্ধুত্ব, সাহস আর শৈশবের গল্প
দিলনাজ বলেন, এসএসসি ২০০০ ব্যাচের বন্ধুরা আমার জীবনের আনন্দের অংশ। বন্ধু মানে এমন জায়গা যেখানে মন খুলে হাসা যায়, কাঁদা যায়, নিজের পুরনো সত্তায় ফিরে যাওয়া যায়।”
একবার ছোটবেলায় বন্যার সময় স্কুলে যাওয়ার পথে নৌকায় উঠতে গিয়ে হঠাৎ পানিতে পড়ে যান। সবাই আতঙ্কে চিৎকার করেছিল, পরে তাঁকে টেনে তোলে বন্ধুরাই। আজও সেই গল্প সবাইকে হাসির উদ্রেক করে।
অবসরে তিনি পছন্দ করেন রান্না করতে এবং নতুন কিছু শিখতে। যখনই নতুন কোনো হস্তশিল্প দেখে মনে হয়, “এটা আমি করব।” রবীন্দ্রনাথের গান, হিন্দি আধুনিক সুর, বা প্রেরণাদায়ক বই সবই তাঁর প্রিয়। বিজ্ঞানের বই পড়তে ভালোবাসেন, কারণ তাঁর মতে “বিজ্ঞান শেখায় কীভাবে অসম্ভবকে সম্ভব করতে হয়।”
সংসার ও নতুন অধ্যায়
সময় এগোতেই বিয়ে, সংসার, সন্তান জীবন ঘুরে গেল নতুন পথে। সংসারে আছে এক মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়ে লিখাপড়া ও পরিবারের কাজে বেশ মনোযোগী, ছেলে একটু দুষ্টু তবে দুজনেই মায়ের গর্ব। তিনি বলেন,
“ওরা আমার প্রাণ। আমি চাই ওরা শিখুক পরিশ্রমই মানুষকে বড় করে।”
বিয়ে হওয়ার পর তিনি বুঝতে পারলেন, সমাজে নারীদের নিজের জায়গা তৈরি করা কত কঠিন। প্রথমদিকে সংসার, সন্তান, ঘর সবকিছুই তাঁকে ব্যস্ত রেখেছিল। কিন্তু ভেতরের শিল্পীটা চুপচাপ বসে থাকতে পারছিল না। মাঝে মাঝে কাগজে নকশা আঁকতেন, কাপড়ে এমব্রয়ডারি করতেন, ফুল বানাতে, বাসায় তেরী হোমমেড খাবার যেমন নারিকেল নাড়ু, কুমড়ো বড়ি, কেক, আমসত্ব শুধু নিজের তৃপ্তির জন্য।
২০২০ সালের করোনা মহামারির পর সবকিছু বদলে গেল। বাইরের দুনিয়া বন্ধ হলেও, তাঁর মনের ভেতর খুলে গেল নতুন দরজা। ছোট বোন বলল,“আপা, তোমার হাতে এত সুন্দর কাজ, তুমি কেন এটাকে পেশা হিসেবে নিচ্ছো না?”
সেই কথাই জীবন বদলে দেয়। সাহস হারাননি দিলনাজ। নিজের হাতের কাজকেই পুঁজি করে শুরু করলেন হস্তশিল্প ব্যবসা। বাসার তৈরি হোমমেড খাবার, নকশি কাঁথা, নারিকেল নাড়ু, কুমড়ো বড়ি, কেক, আমসত্ব যা কিছু সম্ভব ছিল তাই নিয়ে প্রথম বিক্রি প্রচার প্রচারণা শুরু স্বপ্নের নকশির ব্যানারে ফেসবুকের মাধ্যমে। তিনি বললেন
“সেদিন আমি কেঁদেছিলাম। মনে হয়েছিল আমি পারব।”
ক্রমে তাঁর কাজ ছড়িয়ে পড়তে লাগল। স্থানীয় সকল সংস্থার মেলায় অংশ নেওয়া, একসময় তাঁর পণ্য জেলার বাইরে পৌঁছলো। এমনকি বাংলাদেশের বাইরে ভারত-বাংলাদেশ বণিক সংগঠন আয়োজিত মালদা মৈত্রী মেলায় হাজির হয়েছিলেন। সমাজের নানা মন্তব্য, বাঁকা কথা, সন্দেহ সব সহ্য করেছেন। দিলনাজ খানম আরো বলেন:“সমাজ বদলাতে হলে কাজ দিয়েই প্রমাণ দিতে হয়।”
পরিবার থেকেও শুরুতে কিছু দ্বিধা ছিল, কিন্তু সফলতার পর সবাই পাশে এসে দাঁড়াল। স্বামী এখন বলেন, “আমার স্ত্রীর কাজ নিয়ে আমি গর্ব করি।”
আজ দিলনাজ খানম শুধু একজন উদ্যোক্তা নন তিনি এক অনুপ্রেরণা। জেলার নারী উদ্যোক্তা ফোরামের সদস্য, স্থানীয় প্রশাসনের প্রশংসাপত্র প্রাপ্ত, এমনকি উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ “জয়িতা নারী” সম্মানেও ভূষিত।
তিনি বলেন,“যখন কেউ বলে আপার জন্য আমি কাজ শুরু করেছি তখন মনে হয়, এটাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।” তাঁর হাতে তৈরি পণ্যে ফুটে ওঠে রঙ, নকশা, যত্ন আর ভালোবাসা। এখন তাঁর হাতের তৈরি পণ্য শুধু ব্যবসা নয়, এটি এক নারীর স্বপ্নের বাস্তবায়ন। তাঁর কাছ থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন অনেক নারী নিজেদের বাড়িতে কাজ করছেন, অর্থ উপার্জন করছেন। তিনি বলেন, “আমি চাই, আমার কাজের হাত ধরে আরো নারীরা নিজেদের পায়ে দাঁড়াক। আমি চাই আমার নামের আগে শুধু ‘উদ্যোক্তা’ না, ‘পরিবর্তনের কারিগর’ লেখা থাকুক।”
রাতের বেলায় জানালার পাশে বসে চাঁদের আলোয় হাত রেখে বিশ্রাম নিলে হয়তো মনে পড়ে ছোটবেলার সেই স্যান্ডেলের গল্প। বাবা বলেছিলেন, “মিথ্যা কখনো বলিস না।”
আজ তিনি সত্যি ও পরিশ্রমের শক্তিতে তৈরি করেছেন নিজের পথ।
দিলনাজ খানমের গল্প শুধু এক নারীর সাফল্যের কাহিনি নয় এটা এক নারীর সাহস, পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসের উপাখ্যান। তিনি প্রমাণ করেছেন
“নিজের হাতে গড়া আলোর পথই সবচেয়ে উজ্জ্বল।”
তৌফিকুল ইসলাম: লেখক ও সম্পাদক, স্বর্ণালী সাহিত্য পরিষদ