যানজটে নাকাল চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে অটোরিকশা বা ইজিবাইক, যে নামেই ডাকা হোক না কেন, এগুলো রাস্তায় আসায় জনসাধারণ কম ভাড়ায় গন্তব্যে যেতে পারছে। তবে এতে জনসাধারণ উপকৃত হলেও শহরের রাস্তার কথা বিবেচনায় না নিয়ে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি এসব যানবাহন রাস্তায় নামানোর কারণে তীব্র যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। কেউ ভাড়া পাচ্ছে তো কেউ পাচ্ছে না। তবুও প্রতিদিন এসব গাড়ির সংখ্যা হুহু করে বাড়ছে। গোটা শহর চলে যাচ্ছে ইজিবাইকের দখলে। বিআরটিএ বা ট্রাফিক পুলিশ কিংবা পৌরসভা কারো কাছেই এসব যানবাহনের কোনো পরিসংখ্যান নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানের জন্য এসব গাড়ি কিনতে টাকাও বেশি লাগে না। আবার অনেক মানুষ আছেন, যারা এসব গাড়ি কিনে ভাড়ায় খাটাচ্ছেন। এতে অনেক বেকার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। ভাড়ায় এসব গাড়ি চালিয়ে খুব বেশি যে আয় হচ্ছে তা কিন্তু নয়; তবুও কাজ না থাকায় মানুষ এসব গাড়ি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসছে। এমনকি কিশোররাও চালক হয়ে এসব যানবাহন নিয়ে রাস্তায় নেমে আসছে। আবার অনেকে আছেন, যারা একসময় বড় কোনো গাড়ি চালাতেন এখন তারা ইজিবাইক চালাচ্ছেন। সিংহভাগ চালকের ট্রাফিক আইন বা সাইন সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। ফলে তারা যেখানে মনে হচ্ছে, সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়ছেন। এর ফলে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে।
এদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের বিভিন্ন রাস্তায় বর্তমানে চলছে ড্রেন নির্মাণ কাজ। যেসব স্থানে এই নির্মাণ কাজ চলছে, সেসব এলাকায় যানজটের মাত্রা আরো বেশি। তার ওপর সরু রাস্তার দুই পাশে অবৈধ দোকানপাট, মোটরসাইকেল পার্কিং সব মিলিয়ে জেলাশহরে যানজট তৈরি করছে। এতে গন্তব্যে পৌঁছাতে জনসাধারণকে নির্দিষ্ট সময়ের অধিক সময় ব্যয় করতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা পড়ছে বিপাকে। তারা সময়মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাজির হতে পারছে না। এছাড়া একটু বড় গাড়ি কোনো কারণে কোনো রাস্তায় ঢুকলে লম্বা যানজট হচ্ছে।
এমন চিত্র চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহরের নিউমার্কেট, মুরগিপট্টি এলাকা, নিউমার্কেট-ক্লাব সুপার মার্কেট সড়ক, বড়ইন্দারা মোড়, পরাতন বাজার, নিমতলা, শান্তিমোড়সহ অন্যান্য এলাকার। এসব এলাকার যানজট সরাতে ট্রাফিক পুলিশকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
নাম প্রকশে অনিচ্ছুক অনেক ব্যক্তি বলছেন, ‘অবৈধ’ অটোরিকশার দখলে চলে গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলাশহর। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দাবড়ে বেড়াচ্ছে হাজার হাজার অটোরিকশা। অবৈধ দখলে চলে গেছে ফুটপাত। পৌরসভার পক্ষ থেকে এসব অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদ করার পরদিনই আবার বসে যাচ্ছে। ফলে থামছে না যানজট। চরম দুর্ভোগে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ সাধারণ মানুষ।
জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) এ.এন.এম. ওয়াসিম ফিরোজ বলেন— আমাদের ছোট শহরের তুলনায় ইজিবাইক অনেক বেশি, যানজট কমাতে হলে এই বাইকের সংখ্যাটা কমাতে হবে। তিনি বলেন, ইজিবাইকগুলোকে একটা নীতিমালার আওতায় এনে লাইসেন্স দেয়া যেতে পারে। অথবা যেসব ইজিবাইক শহরে ঢুকবে, সেগুলোকে একটি নির্দিষ্ট রঙ করে দেয়া যেতে পারে। এ জন্য জেলা প্রশাসন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা, বিআরটিএ, পুলিশ, সুধীজনদের নিয়ে একটা নীতিমালা তৈরি করা যেতে পারে। আর মহাসড়কে যখন কোনো থ্রিহুইলার উঠবে, তখন সেগুলোকে আটক করে ডাম্পিং করতে হবে। তবে আমাদের জন্য এটা কঠিন, কারণ আমাদের ডাম্পিং স্টেশন নেই। আমরা ইজিবাইক চালকদের মহাসড়কে উঠতে নিষেধ করি। তবে এ নির্দেশনা কেউ মানে, কেউ মানে না।
ইজিবাইকের সংখ্যা কত?— জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটার সঠিক হিসাব আমাদের কাছে নেই। ট্রাফিক পুলিশের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাত্র ২২ জন ট্রাফিক পুলিশ। তারপরও আমরা চেষ্টা করে যাচ্ছি যানজট নিরসনের। তিনি আরো জানান, ২০২৪ সালে ৬৮১টি অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং ২ কোটি ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া চলতি বছরের আক্টোবর মাস পর্যন্ত ৩৪৪টি মামলা করা হয়েছে এবং ১ কোটি ৩৬ লাখ ৯৫ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
এদিকে বিআরটিএ’র জেলায় কর্মরত সহকারী পরিচালক মো. শাহজামান হক বলেন— বিআরটিএ’র কাছে শুধু নিবন্ধিত যানবাহনের তালিকা আছে, ইজিবাইক বা ট্রলি, নসিমন-করিমনের যেহেতু নিবন্ধন নেই, সেহেতু এসব যানবাহনের পরিসংখ্যানও আমাদের কাছে নেই।
শহরের যানজট নিরসনের বিষয়ে আলাপকালে চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক ও জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক উজ্জ্বল কুমার ঘোষ বলেন, এর আগে চাঁপইনবাবগঞ্জ পৌরসভা ১ হাজার ৮০০ ইজিবাইককে নিবন্ধনের আওতায় এনেছিল। মাঝে এই কার্যক্রম বন্ধ ছিল। নতুন করে আবারো শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে ৩ শতাধিক ইজিবাইকের নিবন্ধন নবায়ন করা হয়েছে। আমরা সকল অংশীজনের সঙ্গে কথা বলছি, কীভাবে যানজট কমানো যায়, সে বিষয়ে কথাবার্তা চলছে।
শান্তিমোড়ের যানজট নিরসনে ওভারপাস করলে কেমন হয়— এমন প্রশ্নের জবাবে উজ্জ্বল কুমার ঘোষ বলেন, আইডিয়াটা মন্দ না।
প্রসঙ্গত, গত ২৩ অক্টোবর চাঁপাইনবাবগঞ্জে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের মধ্যে অনুদানের চেক বিতরণ অনুষ্ঠানে বিআরটিএ’র চেয়ারম্যান ও সরকারের অতিরিক্ত সচিব আবু মমতাজ সাদ উদ্দিন আহমেদ বলেছিলেন, ইজিবাইকসহ অন্য গাড়িগুলোর সঙ্গে অনেক মানুষের কর্মসংস্থান জড়িয়ে আছে, তাদেরকে হুট করে রাস্তা থেকে তুলে দেয়া যাবে না। তাই তাদেরকে একটি শৃঙ্খলার মধ্যে নিয়ে আসার কথা ভাবা হচ্ছে।