শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

সাজিদের মৃত্যু ও আমাদের দায়বদ্ধতা : শিশুদের নিরাপত্তায় নতুন ভাবনা
তৌফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশে প্রতিবছর অসাবধানতা, অবহেলা এবং সচেতনতার অভাবে অসংখ্য ছোট্ট শিশু প্রাণ হারায়। শিশু মৃত্যুর এই মর্মান্তিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে আমরা দেখব—সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে পানিতে ডুবে, খোলা নালা-খাল-পুকুরে পড়ে, কিংবা গভীর নলকূপ, ড্রেন, নির্মাণাধীন গর্ত বা বাড়ির আশপাশের বিপদজনক জায়গায় আটকে গিয়ে। আমাদের সমাজ,
পরিবার এবং প্রশাসন—সবাই যদি একটু বেশি দায়িত্বশীল হতো, তাহলে এই অকাল মৃত্যু অনেকটাই কমে আসত।
রাজশাহীর তানোর উপজেলার কোয়েল গ্রামে ঘটে যাওয়া হৃদয়বিদারক ঘটনাটি আবারও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো—একটি শিশুর এক মুহূর্তের চঞ্চলতা এবং একটি পরিবারের সামান্য অসতর্কতা কেমন ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে। গ্রামের একটি গভীর নলকূপের ভেতরে আটকে পড়ে ছোট শিশু সাজিদ। দীর্ঘ ৩২ ঘণ্টা ধরে তার জন্য লড়েছে স্থানীয়
মানুষ, ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী—সবাই। কোটি মানুষের দোয়া, অপেক্ষা এবং প্রার্থনা ছিল যেন সাজিদকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। অবশেষে তাকে উদ্ধার করা গেলেও হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সাজিদকে মৃত ঘোষণা করেন। পুরো দেশ শোকাহত, পরিবার বিধ্বস্ত, সমাজ ব্যথিত।
সাজিদের মৃত্যু আমাদের শুধু কাঁদায় না—এই ঘটনা আমাদের সামনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়:
আমরা কি সত্যিই আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পেরেছি? আমরা কি যথেষ্ট সতর্ক? শিশুদের জন্য বাড়ি, উঠান, রাস্তা, স্কুল বা খেলার মাঠ—কোনোটাই কি যথেষ্ট নিরাপদ?
আজকে এই কলাম লেখার উদ্দেশ্য দুঃখের গল্প বলা নয়—বরং সেই দুঃখ থেকে শিক্ষা নেওয়া। যেন ভবিষ্যতে আর কোনো সাজিদকে আমাদের হারাতে না হয়।
১. বাংলাদেশের শিশুদের দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর বাস্তব চিত্র
বাংলাদেশে প্রতিবছর হাজার হাজার শিশু দুর্ঘটনাজনিত কারণে মারা যায়—তার প্রায় অংশই ঘটে পানিতে ডুবে। বাকি অংশের বড় অংশ পড়ে খোলা গর্ত, নলকূপ, নির্মাণাধীন জায়গা, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা ইত্যাদির মাধ্যমে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৃত্যু ঘটে খুব সাধারণ কিছু ভুলে, যেমন—
আঙিনায় পানি জমে থাকা, বাড়ির সামনে খোলা পুকুর, গভীর নলকূপ বা ড্রেন খোলা থাকা,বড় গর্ত বা নির্মাণাধীন জায়গা অপরিচ্ছন্ন থাকা, শিশুদের একা রেখে ব্যস্ত হয়ে পড়া। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে শিশুদের খেলার স্বাধীনতা আছে, কিন্তু সেই স্বাধীনতা যদি নিরাপদ না হয়, তাহলে তা প্রাণঘাতী হতে পারে।
২. শিশুর দুর্ঘটনার মূল কারণ: অবহেলা নাকি অসচেতনতা?
আমাদের দেশে শিশুর প্রতি ভালোবাসার কারো কোন কমতি নেই, কিন্তু সচেতনতার অভাব ভয়ংকর।
বিশেষ করে গ্রামীণ পরিবেশে অভিভাবকদের কাজে ব্যস্ততা, ঝুঁকির স্থান সম্পর্কে কম ধারণার,
কিংবা ‘কিছু হবে না’—এই মানসিকতার জন্য শিশুরা সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে।
ক. মাত্র কয়েক সেকেন্ডের অগোচরেই দুর্ঘটনা ঘটে যায় শিশুরা মুহূর্তেই নতুন জায়গায় চলে যেতে পারে। সামান্য সময়ের জন্য মা কাপড় আনতে গেলেন, বাবা মাঠে কাজে গেলেন—এমন সময়েই বিপদ ঘটে যায়।
খ. খোলা গর্ত, নলকূপ, ড্রেনের প্রতি উদাসীনতা
আমাদের দেশে বাড়ির আশেপাশে খোলা গর্ত বা গভীর নলকূপ খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। এগুলো শিশুদের জন্য প্রাণঘাতী হলেও মালিকরা ‘এতে কিছু হবে না’ ভাবনায় তা ঢেকে রাখেন না।
গ. পরিবেশগত নিরাপত্তার অভাব
বাড়ি বা গ্রামের রাস্তার পাশে পুকুর, নালা, সেচের খাল—এসবই শিশুদের কাছে খেলাধুলার জায়গা মনে হয়।
ঘ. শিশু পর্যবেক্ষণের অভাব
‘বাচ্চা তো খেলে খেলেই থাকে’—এই ছেলেমানুষি চিন্তাই সবচেয়ে বড় বিপদ।
৩. সাজিদের মৃত্যু আমাদের কী শিক্ষা দেয়?
রাজশাহীর কোয়েলগ্রামের ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের নয়—এটি পুরো জাতির জন্য শিক্ষা।
এই ঘটনাটি দেখায়—বাড়ির আশপাশে খোলা যেকোনো গভীর জায়গা বিপজ্জনক। শিশুদের কখনোই দীর্ঘ সময় নজরের বাইরে রাখা যায় না গ্রামে কিংবা শহরে, অভিভাবক ও প্রতিবেশীদের সম্মিলিত সতর্কতা জরুরি। জরুরি উদ্ধার ব্যবস্থা দ্রুত সক্রিয় হওয়া প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো—একটি ছোট ভুল একটি শিশুর পুরো জীবন কেড়ে নিতে পারে।
৪. আমরা কীভাবে এই ধরনের দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করতে পারি?
শিশু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, সমাজ ও অভিভাবক—সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। নিচে সহজ ভাষায় সবচেয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতাগুলো তুলে ধরা হলো—
ক. খোলা নলকূপ, ড্রেন, গর্ত—অবশ্যই ঢেকে রাখুন। যে কোনো গভীর নলকূপ, মাটি কাটার গর্ত, সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনা, নির্মাণাধীন জায়গা—এসব শিশুদের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক।
অভিভাবকদের করণীয়—
ঘরের কাছে খোলা গর্ত থাকলে তা সঙ্গে সঙ্গে ঢেকে রাখবেন। নলকূপ মেরামত বা স্থাপন শেষে মুখ ঢেকে তালা দিন।
বাড়ি নির্মাণের সময় খোলা জায়গা অস্থায়ী বেড়া বা জাল দিয়ে ঘিরে রাখুন। সেপটিক ট্যাংকের ঢাকনা শক্ত কিনা নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
খ. পানির আশেপাশে শিশুদের কখনোই একা রাখবেন না।
পুকুর, নালা, খাল, বাগানে পানি জমে থাকা—এসব জায়গা শিশুদের কাছে আকর্ষণীয়। অতএব—১০ বছরের নিচে শিশুদের। পুকুর বা নালার পাশে একা খেলতে দেবেন না। বর্ষায় বাড়ির আঙিনায় পানি জমলে তা দ্রুত সরান। পানির কাছাকাছি খেলাধুলার জায়গা বন্ধ করে দিন।
গ. গ্রামে বাড়ির সামনে পুকুর থাকলে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিন। বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে বাড়ির পাশে পুকুর থাকে।
এই পুকুরে শিশুদের মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ঘটে। কী করবেন—পুকুরের চারপাশে বাঁশের বেড়া বা জাল দিয়ে ঘিরে রাখুন। পুকুরের ধার ঘেঁষে খেলার জায়গা তৈরি করবেন না।
ঘ. শিশুদের সাঁতার শেখান।
সাঁতার শেখানো পানিতে ডুবে মৃত্যুহার কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়। গ্রামে ৬ বছর বয়স থেকে সাঁতার শেখানো গেলে শিশুরা ভয় পায় না এবং বিপদ থেকে নিজেই বের হতে পারে।
ঙ. অভিভাবক নিজে সচেতন হোন।
কাজের ব্যস্ততায় শিশুদের নজর আড়াল করবেন না। যখন শিশু বাইরে খেলবে, একজন বড় মানুষকে নিয়োজিত রাখুন।
মোবাইল ফোনে ব্যস্ত হয়ে বাচ্চাকে একা ছেড়ে দেবেন না—এটি আজকের যুগে বড় ভুল।
চ. প্রতিবেশী ও সমাজের দায়িত্ব।
শিশু নিরাপত্তা শুধু পরিবার নয়, পুরো সমাজের দায়িত্ব। যেখানে খোলা গর্ত, ড্রেন, নলকূপ বা বিপদজনক কিছু দেখা যাবে, সবার উচিত দ্রুত তা ঢেকে রাখা বা মালিককে সতর্ক করা। ‘এটা আমার না, অন্যের’—এই ভাবনা একেবারে বাদ দিতে হবে।
ছ. স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা
প্রতিটি ইউনিয়ন/পৌরসভায় নিম্নলিখিত উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন—শিশু নিরাপত্তা সচেতনতা ক্যাম্পেইন।
খোলা ড্রেন বা বিপদজনক নির্মাণস্থল পরিদর্শন। বাড়ির মালিককে নোটিশ দিয়ে বিপদজনক স্থান ঢেকে রাখা বাধ্যতামূলক করা। স্কুলে স্কুলে শিশু নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ।
৫. কেন আমরা এত অবহেলাপূর্ণ? মানসিকতা বদলানো জরুরি
বাংলাদেশে দুর্ঘটনা বাড়ার প্রধান কারণগুলোর একটি হলো—“আমাদের কিছু হবে না”—এই ভুল ধারণা।
যেখানে উন্নত দেশে প্রতিটি বিল্ডিং নির্মাণে নিরাপত্তা মানা বাধ্যতামূলক, আমাদের দেশে তা এখনও অবহেলার শিকার।
শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা যত না ভাবি, তার চেয়ে হাজার গুণ বেশি ভাবি মোবাইল, টাকা, গয়না, বাড়ির তালা নিয়ে। এই মানসিকতা বদলানো দরকার।
৬. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের করণীয়
স্কুলগুলোর উচিত—শিশুদের নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতন করা। পুকুরের কাছে স্কুল হলে বেষ্টনী দেওয়া। শিক্ষক ও কর্মচারীদের দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া। জরুরি উদ্ধার পদ্ধতি শেখানো (যেমন—কেউ পানিতে পড়লে কী করতে হয়)।
৭. সাজিদের জন্য আমাদের শোক—এবং অন্য প্রতিটি শিশুর জীবনের প্রতি দায়িত্ব
সাজিদের মৃত্যু একটি পরিবারকে চিরতরে অন্ধকারে ডুবিয়ে দিয়েছে। কিন্তু তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আমাদের চোখ খুলে দেওয়া উচিত। যেন আর কোনো শিশুর মৃত্যু এভাবে না ঘটে—না কোনো নলকূপে, না কোনো ড্রেনে, না কোনো গর্তে, না কোনো পুকুরে।
প্রতিটি শিশু দেশের ভবিষ্যৎ। তাদের জীবন রক্ষায় আমরা যদি একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে এই ধরনের দুর্ঘটনা অনেকটাই ঠেকানো সম্ভব।
পরিশেষে বলতে চাই: শিশুর নিরাপত্তা—এটি অবহেলার নয়, দায়িত্বের বিষয়।
অভিভাবকরা নিজেদের সন্তানদের সবচেয়ে ভালোবাসেন। কিন্তু ভালোবাসা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার সঙ্গে সচেতনতা যোগ হয়। একটি ছোট ভুল একটি শিশুর জীবন কেড়ে নেয়, একটি পরিবার ভেঙে দেয়, একটি সমাজকে কাঁদায়।
তাই আজই সিদ্ধান্ত নিন—আপনার বাড়িতে বা আশপাশে কোনো বিপদজনক জায়গা থাকলে তা ঢেকে ফেলুন। বাচ্চাকে কখনোই নজরের বাইরে রাখবেন না। সমাজে সচেতনতা বাড়ান। সরকারি ও স্থানীয় উদ্যোগকে উৎসাহিত করুন।
শিশুরা হাসবে, খেলবে, বেড়ে উঠবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বেড়ে ওঠা যেন নিরাপদ পরিবেশে হয়—এটাই আমাদের সবার দায়িত্ব।
সাজিদের জন্য দোয়া এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি শিশুর প্রতি আমাদের অঙ্গীকার— আর কোনো শিশুকে অযথা, অবহেলায়, দুর্ঘটনায় হারাতে দেব না।

লেখক পরিচিতি: তৌফিকুল ইসলাম, সম্পাদক, স্বর্ণালী সাহিত্য পরিষদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

শেয়ার করুন