বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা : জলবায়ু পরিবর্তন ও অভিযোজনে প্রয়াসের অগ্রযাত্রা
বকুল কুমার ঘোষ

বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘায়িত শুষ্কতা দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল— বিশেষত বরেন্দ্র অঞ্চলকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। মানবস্বাস্থ্য, কৃষি, পশুপালন, জীবিকা ও আর্থসামাজিক অবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল—চাঁপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ এবং আশপাশের জেলাগুলো আজ জলবায়ু পরিবর্তনের নীরব কিন্তু শক্তিশালী অভিঘাতে ক্রমেই আরো ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। অন্যান্য দুর্যোগের তুলনায় খরা ধীরগতি হলেও এর প্রভাব দীর্ঘস্থায়ী ও ব্যাপক। বরেন্দ্রর উচ্চভূমি, রুক্ষ মাটি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানি কমে যাওয়া এবং দীর্ঘ খরার ঋতুগুলো এখানকার মানুষের জীবনে সৃষ্টি করছে বহুমাত্রিক ঝুঁকি।
দারিদ্র্য, পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি, রোগবালাইয়ের পুনরাবৃত্তি, জীবিকা সংকট— সব মিলিয়ে এই অঞ্চল যেন এক অনবরত সংগ্রামের ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রতিচ্ছবি।
এই কঠিন বাস্তবতার মাঝে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি তিন দশক ধরে পাশে দাঁড়িয়ে আছে প্রান্তিক মানুষের। দরিদ্র পরিবার, নারী, যুব, শিশু, বয়স্ক, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী— তাদের জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি ইসিসিসিপি-ড্রাউট প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে তুলছে নতুন সম্ভাবনা ও আত্মবিশ্বাস। খরার এই চাপ মোকাবিলায় ইসিসিসিপি-ড্রাউট প্রকল্প প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিযোজন ক্ষমতা টেকসইভাবে বৃদ্ধিতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। প্রকল্পটি ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে যা অব্যাহত থাকবে ২০২৭ সালের অক্টোবর পর্যন্ত।
বরেন্দ্র অঞ্চলের খরার প্রেক্ষাপট ও কারণ
বরেন্দ্র অঞ্চল উঁচু-নিচু সোপানভূমি, কম বৃষ্টিপাত এবং অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে স্বাভাবিকভাবে শুষ্ক। বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত জাতীয় গড় বৃষ্টিপাতের অর্ধেকের মতো এবং তা অল্প সময়ে কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়, ভূগর্ভস্থ পানি স্তর দ্রুত হ্রাস পায় এবং কৃষি ঋতুতে সেচনির্ভরতা বেড়ে যায়। অপরদিকে খাল-বিলের সংকট, পানি ধারণক্ষমতার ঘাটতি ও অপরিকল্পিত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও বৃষ্টিপাতের অনিশ্চয়তা খরাকে দিন দিন চরমে ঠেলে দিচ্ছে।
খরার বহুমাত্রিক প্রভাব
খরার প্রভাব বহুমাত্রিক এবং ব্যাপক। কৃষি উৎপাদনে এর প্রভাব সর্বপ্রথম লক্ষ্য করা যায়। আমন, বোরো, ডাল, তিল, ভুট্টাসহ সব ধরনের ফসলের উৎপাদন ২০-৬০% পর্যন্ত কমে যায়। সেই সঙ্গে সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রান্তিক কৃষকের মুনাফাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
খরার কারণে মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষিশ্রমিকদের কর্মসংস্থান কমে যায়, পানীয় পানি সংগ্রহে বেশি সময় ব্যয় করতে হয়। পশুখাদ্যের সংকটের কারণে দুগ্ধ উৎপাদনও কমে যায়, যা পরিবারের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক অবস্থাকে দুর্বল করে তোলে।
মানবস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও খরার প্রভাব ব্যাপক। পানির অভাবে পানিবাহিত রোগ, তাপঘাত, ডিহাইড্রেশন ও চর্মরোগ বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে শিশু ও প্রবীণরা এর প্রভাব বেশি অনুভব করে। একই সঙ্গে পশুপালন ও খাদ্য নিরাপত্তা সংকটের সৃষ্টি হয়। খরা বাড়লে মাঠের ঘাস মারা যায়, খড় উৎপাদন কমে যায়, যা পশুপালনের জন্য বড় ধরনের অপুষ্টি এবং রোগব্যাধি বৃদ্ধি করে।
পরিণামে, কৃষি খাতে ক্ষতির কারণে সামগ্রিক আর্থসামাজিক অবনতি ঘটে। দরিদ্রতা বৃদ্ধি পায় এবং বাজারে চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়; যার ফলে মন্দাভাব সৃষ্টি হয়। কাজের অভাবে মৌসুমি মাইগ্রেশন বাড়ে, শিক্ষায় ঝরেপড়া এবং সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়।
খরার এই বহুমাত্রিক প্রভাব একদিকে কৃষক পরিবারকে দৈনন্দিন জীবনে একদিকে সংকটের দিকে ঠেলে দেয়, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতি ও সমাজকেও অস্থিতিশীল করে তোলে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড (জিসিএফ)-এর আর্থিক সহায়তায় এবং পিকেএসএফের কারিগরি সহায়তায় ইসিসিসিপি-ড্রাউট প্রকল্পের মাধ্যমে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি সময় উপযোগী পদক্ষেপসমূহ বাস্তবায়ন করছে আন্তরিকতার সাথে। এই প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে— বরেন্দ্র অঞ্চলের খরা-ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অভিযোজন ক্ষমতা টেকসইভাবে বৃদ্ধি করা।
প্রয়াস এই প্রকল্পের প্রধান কার্যক্রমসমূহ চারটি মূল কৌশলের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে, যা পানি ব্যবস্থাপনায় এক যুগান্তকারী উন্নয়নধারা সংযোজিত হয়েছে। এই কৌশলগুলো হলো—
* Reduce (কমানো) : পানি অপচয় হ্রাস করা।
* Reuse (পুনঃব্যবহার) : বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও পুনঃব্যবহার।
* Recharge (পুনঃভরন) : কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরন নিশ্চিত করা।
* Recycl (পুনঃচক্রায়ন) : বিভিন্ন খাতের ব্যবহৃত পানিকে পুনঃচক্রায়ন করা।
এভাবে প্রকল্পটি পানি সংরক্ষণ, স্থিতিশীলতা এবং কৃষি ও জীবনধারার টেকসই ব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রধান কার্যক্রমসমূহ
১. কৃত্রিম রিচার্জ কাঠামো নির্মাণ : ৫০টি Managed Aquifer Recharge এবং ২টি Pond Based Managed Aquifer Recharge অবকাঠামো স্থাপন করে ভূগর্ভস্থ পানি পুনরুদ্ধার করা।
২. খালপুকুর পুনঃখনন : ২০টি পুকুর ও ২২ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এলাকার পানি ধারণক্ষমতা বৃদ্ধি, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গবাদিপশুর পানি প্রাপ্তি নিশ্চিত করা।
৩. খরা-সহিষ্ণু ফসল ও কৃষি উদ্ভাবন : ১ হাজার ৫০ জন কৃষককে হাইব্রিড ও স্বল্প-পানিনির্ভর ধান, ডাল, তেলবীজ, ভুট্টা চাষে উৎসাহ প্রদান করা।
৪. স্টেকহোল্ডার সম্পৃক্তকরণ : স্থানীয় সরকার, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, এনজিও, কৃষকগোষ্ঠী ও নারী সংগঠনগুলোর মাধ্যমে অংশগ্রহণমূলক পানি ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা করা।
৫. সচেতনতা বৃদ্ধি ও সক্ষমতা উন্নয়ন : ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাডাপটেশন গ্রুপের ৬৮০ জন সদস্যকে জলবায়ু ঝুঁকি, পানি ব্যবস্থাপনা ও টেকসই কৃষি বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়েছে এবং এই উদ্যোগ চলমান থাকবে।
ইসিসিসিপি-ড্রাউট প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া
১. প্রারম্ভিক চাহিদা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন : প্রকল্পের শুরুতে খরাপ্রবণ এলাকায় প্রাথমিক জরিপ করা এবং অংশগ্রহণমূলক গ্রামীণ (সমীক্ষা) মূল্যায়ন করা হয়েছে; যার ফলে স্থানীয় কৃষক, নারীবৃন্দ ও স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
২. স্থানীয় অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ : চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে ৪২টি কমিউনিটি ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাডাপটেশন গ্রুপ গঠন, স্টেকহোল্ডার সভা ও ফোকাস গ্রুপ ডিসকাশনের মাধ্যমে প্রকল্প পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয় স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে প্রেক্ষাপটের সাথে মানানসই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
৩. অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রযুক্তি প্রয়োগ : Managed Aquifer Recharge (MAR), খাল-পুকুর খনন এবং Alternate Wetting and Drying (AWD) প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
৪. প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি : কৃষক, নারী, কমিউনিটি ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যাডাপটেশন গ্রুপের সদস্য ও স্থানীয় কমিটির সদস্যদের জলবায়ু সহনশীল কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং ফসল উদ্ভাবন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়।
৫. নিরীক্ষণ ও ফলাফল বিশ্লেষণ : প্রতিটি কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। কৃষি উৎপাদন, পানি স্তর, গবাদিপশুর স্বাস্থ্য এবং লক্ষিত জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা নিয়মিত রিপোর্টে বিশ্লেষণ করা হয়।
৬. ফলাফলের সম্প্রসারণ : অভিজ্ঞতা ও সফল মডেল অন্যান্য খরাপ্রবণ এলাকায় সম্প্রসারণের জন্য নির্দেশনা এবং নীতি প্রণয়নে ব্যবহার করা হয়।
ইসিসিসিপি-ড্রাউট প্রকল্প বরেন্দ্র অঞ্চলের খরাপ্রবণ জনগোষ্ঠীর জন্য একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে বাস্তবায়ন হচ্ছে। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, কৃষি উদ্ভাবন, জনগোষ্ঠীভিত্তিক অংশগ্রহণ এবং পরিকল্পিত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সমন্বয়ে প্রকল্পটি একটি টেকসই অভিযোজন মডেল হিসেবে গড়ে উঠেছে, যা দেশের অন্যান্য খরাপ্রবণ এলাকাতেও প্রয়োগযোগ্য।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রায় ১ হাজার ৫০ জন মানুষ সরাসরি উপকৃত হয়েছে, যা তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি পাবে, বার্ষিকভাবে ৬৩ হাজার কিউবিক মিটারেরও বেশি ভূগর্ভস্থ পানির পুনঃভরন নিশ্চিত হবে এবং ১১ হাজারের বেশি মানুষের জন্য নিরাপদ পানীয় জল সরবরাহ করা সম্ভব হবে। দীর্ঘমেয়াদে ১৯০ হেক্টর জমিতে সেচের সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষি উৎপাদনকে স্থিতিশীল করে তুলবে।
প্রান্তিক কৃষকদের মধ্যে ১ হাজার ৫০ পরিবার খরা-সহিষ্ণু প্রযুক্তি Alternate Wetting and Drying (AWD) গ্রহণ করবে, যার ফলে কৃষি উৎপাদন ১৫-২৫% বৃদ্ধি পাবে এবং খরার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। জনগোষ্ঠীভিত্তিক ৪২টি পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় থাকবে, যা স্থানীয় পানি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকল্প বাস্তবায়নের ফলে কৃষিশ্রমিকদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে, পানি সংগ্রহে নারীদের শ্রমব্যয় হ্রাস পাবে, খাদ্য নিরাপত্তা ও পশুখাদ্যের প্রাপ্যতা উন্নত হবে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়ন হবে। এসব উদ্যোগ একত্রে চাঁপাইনবাবগঞ্জের লক্ষিত জনগোষ্ঠীকে দীর্ঘমেয়াদি খরা, জলবায়ুজনিত প্রভাব এবং খাদ্য ও পানির সংকট মোকাবিলায় সহনশীল করে তুলবে। ইসিসিসিপি-ড্রাউট প্রকল্প আমাদের প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় জনগণের জন্য একটি শক্তিশালী প্রতিচ্ছবি হিসেবে দাঁড়াবে এবং ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য খরাপ্রবণ এলাকায় টেকসই অভিযোজন মডেল হিসেবে প্রয়োগযোগ্য হবে।
বকুল কুমার ঘোষ : প্রকল্প সমন্বয়কারী, ইসিসিসিপি-ড্রাউট প্রকল্প