শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

সচেতন হই, বিনামূল্যে আইনি সহায়তা নিই

রেহানা বীথি

বয়স বড়জোর ষোলো হবে। চোখে-মুখে উদ্ভ্রান্ত ভাব। বারবার মায়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে কী যেন বলছে। মা বলছে— চুপ করে বস তো, দেরি আছে। কিন্তু দেরি কেন? চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে হাঁপিয়ে উঠেছে ও। একটু পরপর দুই পা চেয়ারে তুলে বসার চেষ্টা করছে। তবে মায়ের চোখ রাঙানিতে পেরে উঠছে না। সেজন্যে ওর মনটা আরো বেশি অস্থির।
উপরের লেখাটুকু মদিনাকে নিয়ে।
একটু হাবাগোবা, নিতান্ত দরিদ্র মা-বাবার কন্যা মদিনা। আর এ-কারণেই সরকারি নিষেধ অমান্য করে বয়স আঠারো হওয়ার আগেই চুপেচাপে পাশের গ্রামের এক ছেলের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল তার। দরিদ্র মা-বাবা হয়তো ভেবেছিল, তাদের হাবাগোবা মেয়েটার একটা ব্যবস্থা তো হলো! অন্তত দু’বেলা দু’মুঠো অন্ন আর বস্ত্র তো জুটবে!
তা জুটেও ছিল। কিন্তু কিছুদিন পরেই যে হাবাগোবা মেয়েকে দয়া করে বিয়ে করার জন্য জামাইয়ের বাড়ি থেকে যৌতুকের দাবি উত্থাপিত হবে, তা হয়তো মদিনার বাবা-মায়ের ভাবনায় আসেনি। এবং সত্যি সত্যিই যখন তা এলো, তখন তাদের দিশেহারা অবস্থা। যাদের পেটে খাবারই জোটে না ঠিকমতো, তারা যৌতুক দেবে কীভাবে? কিন্তু একথা জামাইয়ের পরিবার শুনবে কেন? তারা মদিনাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করে পাঠিয়ে দিল বাপের বাড়ি।
মদিনার বাবা-মা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আপোস-মীমাংসার চেষ্টা করে ব্যর্থ হলো। সবাই পরামর্শ দিল মামলা করার।
কিন্তু মামলার খরচ? খরচ করে মামলা চালানোর সামর্থ্য তো মদিনার বাবা-মায়ের নেই!
স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ একজন এই দরিদ্র মা-বাবার সেই সমস্যা সমাধানের একটি চমৎকার পথ বলে দিলেন। বললেন— লিগ্যাল এইড অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করো। এই অফিসে যোগাযোগ করে মামলা করলে কোনো খরচ লাগে না। সরকারি খরচেই তোমার মেয়ের মামলা চালানো হবে। পথঘাট চিনিয়ে তিনিই ওদেরকে নিয়ে এলেন লিগ্যাল এইড অফিসে।
এখন, এই অফিসে এসে ওরা প্রয়োজনীয় আইনি পরামর্শসহ পাচ্ছে একেবারে বিনা খরচে মামলা চালানোর সুব্যবস্থা।
এ তো গেল একজন মদিনার গল্প। কিন্তু এমন অনেক মদিনা আছে আমাদের দেশে, যারা এখনো আইনের দোরগোড়ায় পৌঁছুতে পারে না। কারণ, অজ্ঞতা। আমাদের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই শিক্ষার আলো থেকেও বঞ্চিত। তারা অনেকেই এখনো জানেই না, নিখরচায় সম্পূর্ণ আইনি সহায়তা তারাও পেতে পারে। আর জানে না বলেই বিভিন্নভাবে নির্যাতিত হয়েও শুধুমাত্র আর্থিক অবস্থা বিবেচনা করে অগ্রসর হতে পারে না।
যদিও সরকারিভাবে লিগ্যাল এইড সম্পর্কে জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয় এবং হচ্ছে, তবুও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর অনেকের কাছেই তা পৌঁছাতে পারছে না। ফলে তারা বঞ্চিত হচ্ছে। আর এই বঞ্চিত হওয়ার আরেকটি বড় কারণ— কোথায়, কার মাধ্যমে যোগাযোগ করলে সহজে লিগ্যাল এইডের আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে, তা না জানা।
আমার এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় সে বিষয়ে একটু আলোকপাত করার চেষ্টা করছি।
লিগ্যাল এইড (আইনি সহায়তা) হলো দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্য বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ ও প্রতিনিধিত্ব প্রদানের ব্যবস্থা, যা তাদেরকে ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশে সরকার (জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা) এবং বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা ((BLAST) এই সেবা দিয়ে থাকে। যার মাধ্যমে বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ, মামলা পরিচালনা এবং বিরোধ নিষ্পত্তির (যেমন— মধ্যস্থতা) সুবিধা পাওয়া যায়, যা সকলের জন্য আইনি অধিকার নিশ্চিত করতে সহায়ক।
লিগ্যাল এইডের সেবাগুলো হলো—
* বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ প্রদান।
* আদালতে মামলা পরিচালনা বা প্রতিনিধিত্ব করা।
* পারিবারিক ও ছোটখাটো বিরোধের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার মাধ্যমে উদ্যোগ নেয়া।
* জনস্বার্থে মামলা দায়ের করা।

বাস্তবায়নকারী সংস্থা
* সরকারি : জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা (NLASO)— আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করে।
* বেসরকারি : বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST)সহ অন্য বেসরকারি সংস্থাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

কোথায় যোগাযোগ করতে হবে
* আপনার নিকটস্থ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসে।
* BLAST-এর মতো বেসরকারি সংস্থায়।

দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের দরিদ্র অসহায় মানুষের আইনি অধিকার নিশ্চিতে বাংলাদেশ সরকারের যুগান্তকারী উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রতি বছর ২৮ এপ্রিল ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা দিবস’ পালিত হয়। দিবসটি জাতীয়ভাবে পালনের মূল উদ্দেশ্যই হলো বিনামূল্যে আইনি সহায়তা সম্পর্কে অসহায় মানুষকে সচেতন করা। ইতোমধ্যেই সরকারের এই উদ্দেশ্য সফলভাবে সাড়া ফেলতে সক্ষম হয়েছে। এবং আশা করা যায়, অদূর ভবিষ্যতে শতভাগ সফলতা আসবে।
আশার কথা এই যে, চাঁপাইনবাবগঞ্জেও এ নিয়ে এবং গ্রাম আদালত বিষয়ে সচেতনতামূলক কাজ করে যাচ্ছে রেডিও মহানন্দা। প্রতিষ্ঠানটি কমিউনিটি রেডিও প্রোগ্রামস ফর প্রমোটিং জেন্ডার অ্যান্ড ইনক্লুশান ইন দ্য ভিলেজ কোর্ট সিস্টেম প্রকল্পের আওতায় চলতি বছরের শুরু থেকে কাজ করছে বলে জানা গেছে। গ্রাম আদালতে নারী ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং গ্রাম আদালত ব্যবস্থায় নারীর অধিকার ও সুরক্ষাবিষয়ক ফোন-ইন লাইভ টক-শো ও ফেসবুক লাইভ অনুষ্ঠান সম্প্রচার করেছে। এছাড়া জিঙ্গেল, নাটক, গম্ভীরা ও পিএসএ সম্প্রচার করেছে। এসব অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গ্রাম আদালতে সামাজিক সুবিচার এবং গ্রাম আদালতে নারীর ক্ষমতায়ন, কম খরচে, কম সময়ে কীভাবে কোনো হয়রানি ছাড়াই বিচারিক সেবা লাভ করা যায়, নারী ও কন্যাশিশুর সহিংসতায় গ্রাম আদালতের ভূমিকা কী— এই সকল বিষয়ে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষকে সচেতন করে চলেছে রেডিও মহানন্দা।
অতএব, পিছিয়ে থাকবে না কেউ-ই। বঞ্চিতও হবে না কেউ-ই। নারী কিংবা পুরুষ, আর্থিকভাবে অসচ্ছল সকলের জন্যই উন্মুক্ত আছে আইনের দুয়ার। সকলেই পাবেন আইনি সহায়তা এবং নিশ্চিত করতে পারবেন যার যার অধিকার। আর মানুষের অধিকার নিশ্চিত হলেই তো এগিয়ে যাবে আমাদের সমাজ এবং দেশ।
পরিশেষে, আজ রেডিও মহানন্দার ১৫ বছরে পদার্পণ উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি রইল আন্তরিক অভিনন্দন। শুভ জন্মদিন।

রেহানা বীথি : আইনজীবী ও কবি

শেয়ার করুন