শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭ জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

আরো এগিয়ে যাক রেডিও মহানন্দা

মোহা. মোস্তাক হোসেন

তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সমাজ ব্যবস্থায় অবস্থান করছি। এই তথ্যপ্রযুক্তির যুগে কমিউনিটির কৃষ্টি-কালচার তৃণমূলে পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে কমিউনিটি রেডিওর উদ্ভব। যার উদ্দেশ্যই হচ্ছে— স্থানীয় খবরাখবর, কমিউনিটির উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমগুলো পরিবেশনার মাধ্যমে তৃণমূলসহ জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরা। যেসব অঞ্চলে কমিউনিটি রেডিওর কার্যক্রম চলমান রয়েছে, সেখানকার স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চাসহ উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সচেতনতামূলক প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে ব্যাপকতা পেয়েছে। ব্যাপকতা বৃদ্ধির কারণ হলো, সেই লোকালয়ের তৃণমূলের অংশগ্রহণ।
বাংলাদেশে ২০১১ সাল হতে ১৭টি কমিউনিটি রেডিওর কার্যক্রম শুরু করার পর সেগুলো সম্প্রচার চলছে। বর্তমান সম্প্রচারকৃত ১৯টির মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার ‘রেডিও মহানন্দা’ও রয়েছে।
রেডিও মহানন্দায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খবরাখবর ও বিভিন্ন বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম হয়ে থাকে। যা এফএম রেডিও ব্যবহারকারীর আনন্দের খোরাক মেটানোর পাশাপাশি স্থানীয় সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে থাকে। এছাড়াও বিভিন্ন কমিউনিটি ইস্যুতে তৃণমূলকে বিভিন্নভাবে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের দ্বারা সচেতন করা হয়ে থাকে।
রেডিও মহানন্দার প্রোগ্রামগুলো মূলত কমিউনিটি বেইজ, যা স্থানীয় সংস্কৃতিকে তৃণমূলের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ায় মূল লক্ষ্য। রেডিও মহানন্দা যেসব প্রোগ্রামগুলো করে থাকে তা হচ্ছে— বাল্যবিবাহ ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ, নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ সচেতনতা, শিশুসুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাবিষয়ক অনুষ্ঠান, মানবপাচার প্রতিরোধে সচেতনতা, স্থানীয় সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্য তুলে ধরা, ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধভিত্তিক অনুষ্ঠান, আদিবাসীদের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক অনুষ্ঠান, স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও সামাজিক সুরক্ষা, দুর্যোগ প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা সচেতনতা, যুবসমাজের উন্নয়ন ও মাদকবিরোধী কর্মসূচি ইত্যাদি।
এই প্রোগ্রামগুলো তৃণমূলের দোরগোড়ায় পৌঁছানো বা স্থানীয়দের সচেতন করা বা সক্রিয় অংশগ্রহণ করা যায়। আবার লোকজ সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ, পুনরুজীবন দেওয়া ও হারিয়ে যাওয়া রোধ করাও যায়। প্রোগ্রামগুলো সম্প্রচারের মাধ্যমে এসবগুলো বিষয়ই পরিলক্ষিত হচ্ছে। যার দ্বারা রেডিও মহানন্দা শ্রোতার কাছাকাছি, মাইক্রোফোন থেকে জনগণের কাছে, স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ ও স্থানীয় জনজীবনের সেতুবন্ধন তৈরির করার মতো কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ‘বাল্যবিবাহ ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ’ বিষয়ক প্রোগ্রাম। ইউনিসেফ ও জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের তথ্যমতে, বাংলাদেশের তিনটি জেলায় (চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বাগেরহাট ও কক্সবাজার) বাল্যবিবাহের আধিক্যতা বেশি। এ বিষয়ে রেডিও মহানন্দা ধারাবাহিক প্রোগ্রাম প্রচার করে সচেতনতা চালিয়ে যাচ্ছে।
শিক্ষকতার পেশায় থাকার সুবাদে রেডিও মহানন্দার এই সচেতনতামূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে নিজে উপস্থিত হয়েছি। তাছাড়া বিভিন্ন প্রোগ্রামে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের জন্য পাঠিয়ে দেখেছি, সেই প্রোগ্রামগুলোতে তাদের উচ্ছ্বসিত উপস্থিতি। যা আমাকে মুগ্ধ করেছে। তাই রেডিও মহানন্দা শুধু একটি সম্প্রচার মাধ্যম হয়ে, তৃণমূলের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠায় বাঞ্ছনীয়।
এক্ষেত্রে রেডিও মহানন্দার কর্তৃপক্ষের প্রোগ্রামগুলো ধারণ করার সময় কিছুটা ভিন্নতা থাকলে ভালো হয়। যেমন— বাল্যবিবাহ মূলত অশিক্ষিত বা কম শিক্ষিত অভিভাবকদের দ্বারাই ঘটছে বেশি। সেহেতু এই জেলার বাল্যবিবাহের আধিক্য অঞ্চলগুলোতে গিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, স্থানীয়দের নিয়ে প্রোগ্রাম ধারণ করে সম্প্রচার করলে এর ইতিবাচক ফল পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অনুরূপভাবে দুর্যোগকবলিত অঞ্চল, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অধ্যুষিত অঞ্চল, লোকজ সংস্কৃতির চর্চার ক্ষেত্র ভোলাহাটে গিয়েও প্রোগ্রাম ধারণ করে সম্প্রচার করা যায়।
কমিউনিটি রেডিও কেবলই একটি ফ্রিকোয়েন্সি নয়, তৃণমূলের কাছে এর সামাজিক গুরুত্ব ও ভূমিকা তৈরি হয়েছে। এটি একটি সম্প্রচার ব্যবস্থার চেয়েও বেশি কিছু, তাই সবসময় স্টুডিওতে প্রোগ্রামগুলো ধারণ না করে সরাসরি তৃণমূলে হলে রেডিও মহানন্দা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর নিজস্ব কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠবে বলে মনে করি। আশা করি, রেডিও মহানন্দা কর্তৃপক্ষ বিষয়টির দিকে নজর দেবেন এবং এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ নেবেন।

মোহা. মোস্তাক হোসেন : কলাম লেখক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক, পলশা উচ্চ বিদ্যালয়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ

শেয়ার করুন