চাঁপাইনবাবগঞ্জের আদিবাসীদের জীবন সংগ্রাম ও রেডিও মহানন্দা
মো. রেজাউল করিম
চাঁপাইনবাবগঞ্জের কোনো এক সাঁওতাল পাড়ায় বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলেই রেডিও ঘিরে জড়ো হন কয়েকজন মানুষ। কেউ মাঠ থেকে ফেরা ক্লান্ত শরীর মাটিতে এলিয়ে দেন, কেউ শিশুদের কোলে নেয়। ঠিক তখনই ভেসে আসে পরিচিত কণ্ঠ আর সুর— “বাহা সান্দিস”। এই অনুষ্ঠান শুধু একটি রেডিও অনুষ্ঠান নয়; এটি তাদের কথা বলার জায়গা, দীর্ঘদিন জমে থাকা অভিমান প্রকাশের একমাত্র আশ্রয়।
এই অনুষ্ঠান ও রেডিও মহানন্দার সঙ্গে আদিবাসী মানুষগুলোর সম্পর্ক নতুন নয়। গত ১২-১৩ বছর ধরে তারা এই রেডিওকে আপন করে নিয়েছে। মাঠে কাজ করতে গিয়ে, কমিউনিটি সংলাপে বসে কিংবা কোনো সাঁওতাল পাড়ার উঠোনে গল্প করতে গিয়ে দেখেছি— ওরা আমাকে সাংবাদিক বা কর্মী হিসেবে নয়, আপনজন হিসেবেই গ্রহণ করেছে। ভালোবেসে তারা আমাকে ডাকে ‘দাদা’। এই ডাকের ভেতরেই লুকিয়ে আছে বিশ্বাস, সম্মান আর দীর্ঘ পথচলার গল্প।
বরেন্দ্র অঞ্চল— রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ— শত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী সাঁওতাল, কোল, উরাঁও, মুন্ডা, মাহাতো, রাজোয়ার, মুর্মু, সরেনসহ নানা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসভূমি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই জনগোষ্ঠী আজও দারিদ্র্য, ভূমি সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যবঞ্চনার ভার বহন করছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নাধাইকৃষ্ণপুর, চাম্পাতলা, দেলবাড়ি, বাবুডাইং, আতাহার-জুগিডাইং, কামারজগদইল, মিরাকাঁঠাল, ধর্মপুর, আমনুরার টংপাড়া, রহনপুর-নাচোল ও বালিয়াড়াঙ্গা (সাঁওতাল পাড়া)— এসব এলাকা ঘুরলে বোঝা যায়, আদিবাসী জীবনের সংগ্রাম কতটা নীরব অথচ গভীর। অধিকাংশ পরিবারই ভূমিহীন বা প্রান্তিক চাষি। অন্যের জমিতে দিনমজুরির কাজই তাদের প্রধান জীবিকা। মৌসুমি কাজ শেষ হলে অনিশ্চয়তা নেমে আসে জীবনে।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক সংকটটি ভূমি নিয়ে। অনেক আদিবাসী পরিবার চোখে পানি নিয়ে আমাকে বলেছেন— তাদের পৈতৃক জমি তো বটেই, এমনকি শ্মশান ও কবরস্থানও দখল হয়ে গেছে। কোথাও শ্মশানে যাওয়ার রাস্তা নেই। এটি কেবল অবকাঠামোর সমস্যা নয়, এটি তাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও মর্যাদার প্রশ্ন।
শিক্ষা ক্ষেত্রে চিত্র আরো হতাশাজনক। অধিকাংশ শিশু প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না। দূরের স্কুল, আর্থিক অক্ষমতা, ভাষাগত সমস্যা আর অভিভাবকদের সচেতনতার অভাব তাদের শিক্ষাজীবন থামিয়ে দেয়। স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন ব্যবস্থাও করুণ। বরেন্দ্র প্রকল্পের পানি অনেক সময় ঘোলা ও পানের অনুপযোগী। সাবমারসিবল পাম্প অপ্রতুল। এছাড়া পানিবাহিত রোগ তাদের নিত্যসঙ্গী। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাল্যবিবাহ ও দেশীয় মাদক উৎপাদন ও সেবনের মতো সামাজিক ব্যাধি।
এই দীর্ঘ বঞ্চনার ভেতরেই গত এক যুগের বেশি সময় ধরে আশার নাম রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম। ‘সেতু বন্ধন’ অনুষ্ঠান আদিবাসী সমাজের কণ্ঠস্বর হয়ে উঠেছে। এখানে তারা নিজেদের সমস্যার কথা বলে, নিজের গল্প বলে— নির্ভয়ে।
রেডিও মহানন্দার মাধ্যমে আদিবাসীরা প্রথমবারের মতো সরাসরি কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী অফিসার, স্থানীয় শাখার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও সমাজসেবা অফিসারের সঙ্গে। অনেক সমস্যাই প্রশাসনের কানে পৌঁছেছে এই রেডিওর মাধ্যমেই। কোথাও বাল্যবিবাহ রোধে উদ্যোগ এসেছে, কোথাও মাদকবিরোধী পদক্ষেপ, কোথাও ভূমিহীনদের আশ্রয়ণ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির আশ্বাস।
২০২৪ সালে সদর, নাচোল ও গোমস্তাপুর উপজেলায় আয়োজিত কমিউনিটি সংলাপগুলো ছিল আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা। সেখানে তারা তাদের দাবি তুলে ধরেছেন, জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দিয়েছেন। অনেক প্রবীণ সাঁওতাল নেতা আমাকে বলেছিলেন, “দাদা, এই প্রথম আমরা নিজের মুখে কথা বলার সুযোগ পেলাম।”
এই কথাটুকুই সব অর্জনকে অর্থবহ করে তোলে। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবে মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে কাজ করার সুযোগ— এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।
তবে পথ এখনো দীর্ঘ। আদিবাসীদের ভাষা, গান, নৃত্য ও উৎসব হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তরুণদের গণমাধ্যমে যুক্ত করা, সচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
বরেন্দ্রর আদিবাসীরা কেবল সহানুভূতির বিষয় নয়; তারা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের শক্তি। রেডিও মহানন্দার মতো উদ্যোগ প্রমাণ করে— বিশ্বাস আর ভালোবাসা দিয়ে পাশে দাঁড়ালে নীরব মানুষগুলোও কথা বলতে শেখে। আর সেই কণ্ঠস্বর শোনাই এখন আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব, কমিউনিটি রেডিওর মূল অনুপ্রেরণা।
মো. রেজাউল করিম : সহকারী স্টেশন ম্যানেজার, রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম