রেডিও মহানন্দা, নারী সাংবাদিকতা এবং আমি…
উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা
পৃথিবীর সকল মানুষই স্বপ্নের পেছনে ছুটে চলে। এরকমই স্বপ্নের বাহক সৌখিন একজন মানুষের প্রয়াস— বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের চাঁপাইনবাবগঞ্জের রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম।
সালটা তখন ২০১৭। এক্কেবারে শেষ, ডিসেম্বর মাস। কোনো এক তারিখে আমি ‘ভূত এফএম’ শুনছিলাম। হঠাৎই অন্য একটা রেডিও শুনব বলে, স্ক্রল করতে করতে শুনতে পেলাম রেডিও মহানন্দা, তাও আবার আমার জেলা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। একটু আগ্রহ নিয়ে শুনলাম, তখন হচ্ছিল ‘আজকের চাঁপাইনবাবগঞ্জ বুলেটিন’।
পড়ালেখার পাশাপাশি প্রায়ই রেডিও মহানন্দা শুনতাম। এইচএসসি পরীক্ষার পরে সকল বন্ধুরা কোনো না কোনো কাজে লাগার অপশন খুঁজছিল। আর প্রত্যেকেই কাজ পেয়েও যাচ্ছিল। তখন আমারও ভাবনায় কাজ করছিল, আমি কী করতে পারি? কোনো কিছুই মাথায় আসছিল না। কারণ আমি সেরকম কিছু পারি না।
তখন আমার বন্ধু আব্দুস সবুর, সে বলল— ‘তুই তো সাংবাদিকতা করতে চেয়েছিলি। সেই বিষয়ে কাজ করতে পারিস।’ আমি বললাম, ‘সবকিছু লিখে দিতে পারব, কিন্তু সাংবাদিকতার জন্য তো কথা বলতে হবে। আমি তো সবার সামনে কথা বলতে পারি না। আর কম্পিউটার সম্পর্কে আমার তেমন কোনো ধারণাও নেই।’
তখন বন্ধুটি বলল, ‘তুই তো রেডিও মহানন্দায় কাজ করতে পারিস।’
বলা যায়, তার কথামতোই রেডিও মহানন্দায় আবেদন করলাম। যথারীতি ইন্টারভিউ দিয়ে টিকে যাবার পর শুরু হলো রেডিও মহানন্দার একজন ক্ষুদে সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার যাত্রা। যদিও রেডিওতে আরো আনুষাঙ্গিক অনেক কাজ করতে হয়।
কাজ করার সময় দেখেছি, রেডিও মহানন্দা স্থানীয় জনমানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের মাধ্যমে সমাজের সমসাময়িক অবক্ষয়, সমস্যা, প্রয়োজন ও প্রতিকার ইথার তরঙ্গে পৌঁছানোর মাধ্যমে, স্থানীয় কমিউনিটির মানুষের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে, প্রচার করছে সমসাময়িক বার্তা। রেডিও মহানন্দা বিনোদনের খোরাক জোগানোর পাশাপাশি তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে রেডিও মহানন্দার শ্রোতাদের সাথে তাল মিলাতে, ফেসবুক পেজে বিভিন্ন স্থানীয় ও জাতীয় খবর, সচেতনতামূলক- উন্নয়নমূলক ও বিনোদনধর্মী বিষয়গুলোও পোস্ট এবং বিভিন্ন শোগুলো লাইভ করে থাকে। রেডিও মহানন্দা এখন পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে অনলাইনে শোনা যায়, এমনকি স্মার্টফোনে অ্যাপসের মাধ্যমে শোনা আরো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
রেডিও মহানন্দা টিমের সাথে কাজ করার সুযোগ পেয়ে অনেক কিছুই শিখেছি। প্রথমে নিউজ কাভার দিয়ে কাজ শুরু করলেও দীর্ঘমেয়াদি কাজ শুরু হয়েছিল শ্রোতাদের অংশগ্রহণমূলক অনুষ্ঠান “ইচ্ছে দুয়ার” দিয়ে। আমার ভালো লাগার বিষয় এই যে, এই অনুষ্ঠানের প্রযোজক স্বয়ং রেডিও মহানন্দার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হাসিব হোসন ভাইয়া। তিনিই আমাকে সহকারী প্রযোজক হিসেবে নিয়োগ দেন। এরপর থেকেই শুরু।
নিউজে কাজ করার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজেক্টের আওতায় মাঠপর্যায়ে, বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, আদিবাসী ও হরিজনদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অন্যরকম অভিজ্ঞতা জমা হয়েছে কাজের ঝুলিতে। তাছাড়া কথাবন্ধু “অধরা” হিসেবে আজকে আমার এই পরিচিতির পেছনের নামটি হলো— রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮এফএম।
স্থানীয় পর্যায়ে গণমাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিয়েছে রেডিও মহানন্দা। সীমান্ত ঘেঁষা জেলা এই চাঁপাইনবাবগঞ্জের মানুষ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বিশেষ করে নারীরা। এই ছোট্ট শহরটিকে টিভির পর্দায় দেখায় যেত না। তাই এই জেলার নারীদের গণমাধ্যমে অংশগ্রহণ চোখে পড়ার কথায় নয়। এই জেলায় নারী সাংবাদিকতায় যে কজন যুক্ত হয়েছেন বেশির ভাগই রেডিও মহানন্দার মাধ্যমে এসেছেন। বলা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জে নারী সাংবাদিক গড়ার একমাত্র কারিগর হলো কমিউনিটি রেডিও ‘রেডিও মহানন্দা ৯৮.৮ এফএম’। আমার মতো যেসব মেয়েরা স্বপ্ন পূরণ করার স্বপ্ন দেখত, তাদের স্বপ্ন পূরণের হাতেখড়ি হলো— রেডিও মহানন্দা। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য যে, রেডিও মহানন্দা ছেড়ে যাবার পর অনেক নারী এই পেশায় যুক্ত থাকেননি।
প্রতিদিন কাজ শেষে আমার মতো যেসব মেয়েদের বাড়ি ফিরতে রাত হয়ে যায়, তাদের সাহস যুগিয়েছে, কীভাবে একা পথ চলতে হয়। আমার মতো এমন অনেক নারীকে সাংবাদিকতায় কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে রেডিও মহানন্দা। নারীদের পাশাপাশি অনেক তরুণের সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারও শুরু হয়েছে এখান থেকেই। যারা আমার মতো নিজ পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, কিন্তু চোখে স্বপ্ন ছিল অনেক দূর যাবার, তারা রেডিও মহানন্দায় কাজ করার সুবাদে অডিও-ভিডিও এডিটিংয়ের মাধ্যমে একটি পূর্ণাঙ্গ অনুষ্ঠানের প্যাকেজ তৈরি করছেন, যা ভবিষ্যতে অন্যান্য কাজেও লাগবে।
নিজ জেলায় একজন নারী সাংবাদিক হিসেবে নিজেকে এখন অনেক স্ট্রং আর ইনডিপেন্ডেন্ট মনে হয়। সবশেষে বলতে চাই, আজ রেডিও মহানন্দা হাঁটি হাঁটি পা পা করে দীর্ঘ ১৪টি বছর পেরিয়ে ১৫ বছরে পদার্পন করল। দীর্ঘ এই পথচলায় অনেক শ্রোতাবন্ধু এসেছেন, নতুন করে অনেক বন্ধু যুক্তও হচ্ছেন দেশের এবং দেশের বাইরে থেকেও। আর রেডিও মহানন্দাও এগিয়ে যাচ্ছে তার কাজ দিয়ে…।
২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর রেডিও মহানন্দার পথচলা শুরু। আজ তার শুভ জন্মদিনে বলতে চাই, রেডিও মহানন্দার মূল অর্জন হলো— আমার মতো সাধারণ নারীদের ছাড়াও পিছিয়ে পড়া নারীদেরকে তাদের অবস্থান থেকে সমাজের মূল স্রোতে নিয়ে আসতেও নিরলস কাজ করে চলেছে। রেডিও মহানন্দার স্টেশন ম্যানেজারও একজন নারী, তাই আলেয়া ফেরদৌস আপুর কথা না বললেই নয়। যাকে দেখে আমরা সামনে এগিয়ে যাবার অনুপ্রেরণা পাই।
পরিশেষে, রেডিও মহানন্দা আজন্ম বেঁচে থাকুক সর্বস্তরের মানুষের মনের মণিকোঠায় চিরসবুজ হয়ে, প্রজন্মের পরে প্রজন্ম। শুভ জন্মদিন রেডিও মহানন্দা।
উম্মে আয়েশা সিদ্দিকা : কথাবন্ধু ও সহকারী প্রযোজক (অনুষ্ঠান ও খবর), রেডিও মহানন্দা